রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

সাঁঝ বেলার অগ্নুৎসার – রং ও রেখায়


সাঁঝ বেলার অগ্নুৎসার – রং ও রেখায়  

কবিরা ছবি লেখেন । শব্দ দিয়ে, শব্দবন্ধ দিয়ে , বাক্য দিয়ে, উপমা দিয়ে , মেটাফর দিয়ে, সংকেত দিয়ে ।সে ছবি কোন ক্যানভাসে থাকেনা , ফ্রেমে বাঁধিয়ে  রাখে না কেও, সে ছবি পাঠক্ রা দেখতে পান  তাদের মানস লোকে ।রবীন্দ্রনাথ এমন ছবি আঁকার জাদুকর ছিলেন । অল্প কয়েকটি কথার আঁচড়ে আঁকতে পারেন এমন ছবি , যা আঁকিয়েরা অনেক রং খরচা করেও পারে না । 
   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                 রডোডেন্‌ড্রন্‌ গুচ্ছ।  

কবিতা টি প্রথম পড়ার সময়  ‘রডড্রেনডন’ এই খটমট ফুলের নামটি পড়ে ভেবেছি আর কোন ফুলের নাম কি এখানে দেওয়া যেত না ।এ কেমন খেয়াল কবির ? এই রহস্য টি ঠিক ভাবে হৃদয়ঙ্গম করার জন্যে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে এক এপ্রিল মাসের সকালে সিকিমের দু পাশে জঙ্গলময় একটি রাস্তায় যেতে যেতে দু ধারের গাছে গাছে আগুন লাগানো রডড্রেন্ডন গুলি কে দেখা পাওয়া অবধি । তাদের হুলুস্থুল লাগিয়ে দেওয়া ঔদ্ধত্য  নিজের চোখে না দেখলে বুঝতে পারতাম না রবীন্দ্রনাথ যে ছবিটি আঁকতে চেয়েছেন সেটি ওই রডডেন্ড্রন না হলে পরিপূর্ণ হত না।     

ইঁটের 'পরে ইঁট, মাঝে মানুষ-কীট 
 
এই লাইনটি লেখার বহু কাল পরে কলকাতা শহরে ফ্লাট বাড়ির প্রচলন হয় । আর তখনি আমরা বুঝতে পারি একটি মাত্র লাইনে নাগরিক জীবনের কেমন বাস্তব ছবি রবীন্দ্রনাথ এঁকে ছিলেন ।

তখন পাতায় পাতায়   বিন্দু বিন্দু ঝরে জল,
     শ্যামল বনান্তভূমি   করে ছলোছল্‌।
এক পশলা বৃষ্টি হবার পরের দৃশ্যের একটি অবিকল চিত্রকল্প ।  

 বলাকা কাব্য গ্রন্থের ৩৬ নম্বর কবিতায় এ রকম দুটি লাইনে আসন্ন সন্ধ্যার বিলীয়মান আলোয় এক টি নদীর ছবি কি অবলীলাক্রমে এঁকে দেন দুটি পঙক্তি তে ।
‘সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা
     আঁধারে মলিন হল--যেন খাপে-ঢাকা
              বাঁকা তলোয়ার; ’


কিম্বা সহজ পাঠের সে সহজ ভাষায় একটি গ্রামের হাটের ছবি , যা আজকের দিনেও খুব একটা বদলায় নি –
 ‘জিনিষপত্র জুটিয়ে এনে
গ্রামের মানুষ বেচে কেনে ।
উচ্ছে বেগুন পটল মূলো ,
বেতের বোনা ধামা কুলো ,
সর্ষে ছোলা ময়দা আটা ,
শীতের রায়পার নকশাকাটা ।
ঝাঁঝ‍্‌রি কড়া বেড়ি হাতা ,
শহর থেকে সস্তা ছাতা ।
কল্‌‍সি-ভরা এখো গুড়ে
মাছি যত বেড়ায় উড়ে ।‘

এমন ছবি লেখার উদাহরন আরো অনেক অনেক দেওয়া যায় । তাতে অনাবশ্যক ভাবে এই লেখা দীর্ঘায়ত হবে । তাই তা থেকে বিরত থাকলাম ।

আমরা বরং চলে যাই  কবির ছবি লেখা থেকে ছবি আঁকার  কথায় । এ ছবি  কিন্তু অন্য রকম । এ ছবিতে অক্ষর নেই , আছে রেখা ও রঙ । এ ছবিতে দৃশ্য পট নয় , আছে  তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা চেতনার বর্নচ্ছটা , অনুভুতির স্পর্শ ।    

জীবনের উপান্তে এসে , যখন তিনি অমরত্ব পাবার মত সব কিছু অর্জন করে  ফেলেছেন ,সব কীর্তি করায়ত্ত , পেয়ে গেছেন পৃথিবীর সব চেয়ে দামী পুরস্কার , দেশ বিদেশে সম্বর্ধিত হয়েছেন , খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে , তখন কবি কেন হটাৎ এ  রকম ছবি আঁকায় মজে ছিলেন আমাদের মনে এই প্রশ্ন জাগা টা খুব স্বাভাবিক ।  তাঁর বহুগামিতার কথা আমরা জানি , সাহিত্যের কোন শাখাই তিনি বাদ দেন নি তাঁর রচনায়,  কিন্তু তাও শেষ বয়সে নিজেকে প্রকাশ করবার জন্যে কেন তাঁর অন্য একটি নতুন মাধ্যমের দরকার পড়বে , এ কথা  আমাদের ভাবায় ।  

ছোট বেলায় কবি আঁকা শিখেছেন ড্রয়িং শিক্ষকের কাছে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বসে,   আর পাঁচ টা বালকের মত। ছবি আঁকায় তাঁর কোন বিশেষ দক্ষতার কথা শোনা যায় নি ।  ‘ মালতী পুঁথি ’ নামে একটি খাতা পাওয়া যায় যেখানে কবির ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ সালের রচনার সঙ্গে আমরা বেশ কিছু স্কেচ দেখতে পাওয়া যায় ।   তাতেও তেমন কিছু অসাধারনত্ব দেখা  যায় নি ।  

ছোট বেলার  স্মৃতি তে এক জায়গায় তিনি বলছেন –
‘মনে পড়ে, দুপুরবেলায় জাজিম-বিছানো কোণের ঘরে একটা ছবি-আঁকার খাতা লইয়া ছবি আঁকিতেছি। সে যে চিত্রকলার কঠোর সাধনা তাহা নহে-- সে কেবল ছবি আঁকার ইচ্ছাটাকে লইয়া আপনমনে খেলা করা। যেটুকু মনের মধ্যে থাকিয়া গেল, কিছুমাত্র আঁকা গেল না, সেইটুকুই ছিল তাহার প্রধান অংশ। এ দিকে সেই কর্মহীন শরৎমধ্যাহ্নের একটি সোনালি রঙের মাদকতা দেয়াল ভেদ করিয়া কলিকাতা শহরের সেই একটি সামান্য ক্ষুদ্র ঘরকে পেয়ালার মতো আগাগোড়া ভরিয়া তুলিতেছে। জানি না কেন, আমার তখনকার জীবনের দিনগুলিকে যে-আকাশ যে-আলোকের মধ্যে দেখিতে পাইতেছি তাহা এই শরতের আকাশ শরতের আলোক। সে যেমন চাষিদের ধান-পাকানো শরৎ তেমনি সে আমার গান-পাকানো শরৎ-- সে আমার সমস্ত দিনের আলোকময় অবকাশের গোলা বোঝাই-করা শরৎ--  আমার বন্ধনহীন মনের মধ্যে অকারণ পুলকে ছবি-আঁকানো গল্প-বানানো শরৎ।‘

এখানে বোঝা যায় যা মনের মধ্যে থেকে গেল আঁকা গেলনা , তার জন্যে একটা অতৃপ্তি থেকে গেল বালক কবির মনে ।
কিন্তু এর পর আমরা কোথাও তাঁকে ছবি আঁকতে দেখছি না ।যৌবনে শিলাইদহ তে  থাকাকালীন জগদীশ চন্দ্র বসু কে একটি চিঠি লিখে আবেগভরে  জানিয়েছিলেন তিনি ওখানে কিছু ছবি এঁকেছেন । কিন্তু সে ছবির কোন হদিশ পাওয়া যায়নি ।
তাঁর লেখা পান্ডুলিপি তে উনি মাঝে মাঝেই কিছু শৈল্পিক কাটা কুটি করছেন । নিজের খেয়ালে । ও  গুলো কি  তাঁর অঙ্কন শিল্পী হবার অবদমিত ইচ্ছের প্রকাশ ছিল ? তিনি যখন এই সব আঁকি বুকি কাটছেন , তখন সেই জোড়াসাঁকো বাড়ির অন্য কোন ঘরে  বসে তাঁর দুই ভ্রাতুষ্পুত্র ভারতীয় শিল্প জগতে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন । আর রবীন্দ্রনাথ যে এই বিপ্লব থেকে একেবারে নির্লিপ্ত বসে ছিলেন এমন মনে করবার কোন কারন নেই । তবু তিনি নিজে তুলি তুলে নিচ্ছেন না ।  সংকোচের সঙ্গে ভাবছেন – ‘ ঐ যে চিত্র বিদ্যা বলে একটা বিদ্যা আছে  তার প্রতিও আমি হতাশ  প্রনয়ের লুব্ধ দৃষ্টি পাত করে থাকি – কিন্তু আর পাবার আশা  নেই ... অনান্য বিদ্যার মত  তাঁকে তো সহজে পাবার জো নেই – তাঁর একেবারে ধনুরভাঙ্গা পন । ‘

লেখার পাশাপাশি ছবি তিনি আঁকতেই পারতেন । তিনি জানতেন কি ভাবে সময় কে শাসন  করতে হয় । আর প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও যে কোন বিষয় কে গুলে খেতে তাঁর মত আর কেই বা পারতেন । এ দেশ এবং বিদেশের শিল্প আন্দোলনের গতি পথের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কোন ঘাটতি ছিল না।   তাহলে চিত্র বিদ্যার প্রতি এই হতাশ প্রনয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত কেন ? 
আমরা জানতে পেরেছি রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের সম্মন্ধে এমন একটি ধারনা পোষণ  করতেন যে রঙ তাঁর চোখে ধরা পড়েনা । বিশেষ করে লাল রঙ । সেটাই কি তাঁর ভয়ের কারন ছিল ?
অন্তিম জীবনে তিনি কি ভাবে তিনি তাঁর নিজের এই ধারনা কে ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে তাঁর অনেক ছবিতেই লাল রঙ কেই প্রাধান্য দিলেন তা জানা আমাদের পক্ষে কোন দিনই সম্ভব হবে না ।
আমরা দেখলাম তেষট্টি বছর বয়সে তিনি লেখার মায়ায় আবদ্ধ না
 থেকে ধরা দিচ্ছেন রেখার মায়ায় , রঙের রামধনুতে ।
 ১৯২৪ সালে পুরবী কাব্য গ্রন্থের পান্ডুলিপি লেখার সময় লেখার পাতার শুন্য স্থান গুলিতে তাঁর বিভিন্ন ধরনের doodle  গুলি দেখে ফেলেন ভিক্টরিয়া ওকাম্প । তিনিই উৎসাহ দেন আলাদা করে ছবি আঁকার ।
কবি মাতলেন ছবি আঁকায় । এবং রঙ্গে রেখায় একটা হুলুস্থুল বাধিয়ে দিলেন । নেশাগ্রস্তর মত ছবি আঁকতে লাগালেন । তিন বছর পর ১৯৩০ সালে ভিক্টোরিয়া মানে কবির বিজয়া প্যারিসে তাঁর ছবির একটি exhibition এর আয়োজন করলেন ।পরে এই প্রদর্শনী হয় বারমিঙ্হাম , লন্ডন , বারলিন , মুনিখ , ড্রেসডেন , কপেনহেগেন , জেনেভা , মস্কো , বস্টন , নিউইয়রক অ সব শেষে ফিলাডেলফিয়া তে । তাঁর ছবি দেখে ইয়োরোপ ও  আমেরিকার দর্শক দের  মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হল । তবে প্রসংশাই বেশি শোনা গেল । বারলিন ন্যাশানাল গ্যালারি তাঁর পাঁচটি ছবি কিনলেন ।
কবির নিজের চিত্রবিদ্যায়  পারদর্শিতার উপর আস্থা জন্মাল ।
দেশে তাঁর ছবিকে তখন অবধি কেও তেমন করে গুরুত্ব দেয়নি । কিন্তু বিদেশে ছবি দেখে অনেকেই মুগ্ধ হলেন ।বিখ্যাত ফরাসি কবি পল ভ্যালেরি বললেন – your pictures will be lesson to our artists .  ভারতীয় আর্ট ও মন্দির বিশেষজ্ঞ স্টেলা ক্রেম্রিস লিখলেন - ‘Training of the hand is one thing, guidance by the spirit another. The work of Rabindranath Tagore, singularly free from conventions and schooling, is subject to a discipline of its own. It does not stop short at design and composition. Each of the hundreds of drawings and paintings is a living and balanced artistic organism.

আনন্দ কুমার স্বামী,   ভারতীয় শিল্প ও দর্শনের বোদ্ধা হিসেবে যিনি সে সময় জগত বিখ্যাত ছিলেন তিনি লিখালেন - An exhibition of drawings by Rabindranath Tagore is of particular interest because it puts before us, almost for the first time, genuine examples of modern primitive art. One may well wonder how those artists and critics who have so long striven for and praised the more calculated primitivisms, archaisms, and pseudo – barbarisms of European origin will respond; will they admire the real thing?”
 ‘
আসলে রবীন্দ্রনাথ এমন ছবি আঁকলেন যা কোন প্রচলিত ধারায় পড়ে না । তিনি নিজে একদিকে জাপানী শিল্পকলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন , আবার জার্মানি ‘ব্লু রেডার ‘ গোষ্ঠীর কাজের প্রশংসক ছিলেন । গ্রীক ভাস্কর্যের সমঝদার ছিলেন, কিন্তু যখন নিজে ছবি এঁকেছেন তা একান্তই তাঁর নিজের স্টাইলে । কেউ তাঁকে বলেছেন ইমপ্রেশনিস্ট , কেউ বলেছেন এবস্ট্রাক্ট , কেউ বলেছেন আদিম আধুনিক ।

প্রধানত জল রঙ্গেই ছবি আঁকতেন । নিকশ কালো চাইনিজ ইঙ্ক ও ব্যাবহার করতেন । কখনো আবার ফুল থেকে তৈরি রঙ অ ব্যাবহার করেছেন । এ ছাড়া রঙ পেন্সিল , ক্রেওন এ সব ও ব্যাবহার করেছেন । একবার তেল রঙএ ছবি আঁকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন । কিন্তু তেল রঙ তাঁর ভাল লাগেনি । আবার ফিরে গেছেন জল রঙ এই ।    যত টুকু জানা যায় তিনি একটি মাত্র তুলি ব্যাবহার করতেন । রঙ নির্বাচনে বিশেষ ধৈর্য দেখাতেন না ।অনেকসময় পেনের উল্টো দিক এবং আঙ্গুল ব্যাবহার করতেন ছবি আঁকার জন্য । বেশির ভাগ ছবি এক সিটিং এই শেষ করেছেন ।  তাঁর আঁকা নারী মুখ গুলিতে  একটি চাপা বিষণ্ণতা সব সময় থাকতো । একবার নন্দলাল বোস কে বলেছিলেন তাঁর আঁকা নারী মুখ গুলির মধ্যে কাদম্বরী দেবীর মুখ হয়ত ছায়া ফেলেছে  ।

 তিনি ছবিতে সূক্ষ্মতার চেয়ে জোরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন ।
রথীন্দ্রনাথ কে তাই চিঠিতে লেখেন –  ‘আমাদের নববঙ্গের চিত্রকলায় আর একটু জোর সাহস এবং বৃহত্ব দরকার আছে ।এই কথাটা আমার বার বার মনে হয়েছে । আমরা অত্যন্ত ছোট খাটোর দিকে মন দিয়েছি । ‘  এই জোর আমরা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে বার বার দেখি  ।তাঁর ছবিতে অনেক সময়ে দুঃসাহসী রঙের প্রয়োগ দেখা যায় যা প্রথাগত ভাবে খুব স্বাভাবিক নয় ।  উজ্জ্বল হলুদ রঙ তাঁর খুব প্রিয় ছিল । যখন ভ্যান গগ কে বিশেষ কেউ চিনতেন না তখন তিনি ভ্যান গগের ছবির ভক্ত ছিলেন । তার প্রমান , তিনি  কাউকে কখনো অনুকরন  করেন নি , কিন্তু ভ্যান গগের একটি ছবি নকল করেছিলেন ভালবেসে হয়ত ভয়ান গগের ছবির  জোরালো ভাবটাই তাঁকে টেনে ছিল ।

শেষ বয়সে ছবির নেশা যে তাঁকে গ্রাস করছে এবং কাব্য চর্চার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটা তিনি বুঝতেন । নিজেই বলেছেন –
‘ ছবির নেশায় আমার কাব্যের উপর কিছু উৎপাত বাধিয়েছে। অধিক বয়সে তরুনী ভারজা   মানুষকে অভিভুত করে এমন একটা প্রবাদ আছে ।আমার প্রাচীনাটি তরুনীর সঙ্গে পেরে উঠছেনা ।‘

জীবনের উপান্তে এই তরুনী ভারজার প্রতি প্রেম তাকে আরও একবার অস্থির করেছে ।
ঠিক যেমন তরুন রবি সদর স্ট্রিটের বাড়ীর জানলা দিয়ে সুরজদয়  দেখে  নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ লিখে ফেলেছিলেন  তেমনি আরও একবার নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ হল অস্তাচলের রবির চেতনায় ।  
সে রকম আভাষ পাই তাঁর নিজের লেখায় –

‘ আমার বয়স সত্তর হয়ে এলো । আজ তিরিশ বছর ধরে যে দুঃসাধ্য চেস্টা করেছি আজ মনে হচ্ছে যেন ভিত পাকা হবে ।ছবি কোনোদিন আঁকিনি , আঁকবো বলে স্বপ্নেও বিশ্বাস করিনি । হটাত দু তিন বছরের মধ্যে  হু হু করে এঁকে ফেললুম ... এর মানে কি ? জীবন গ্রন্থের সব অধ্যায় যখন শেষ হয়ে এলো তখন অভূতপুর্ব  উপায়ে আমার জীবন দেবতা এর পরিশিষ্ট রচনা উপকরন জুগিয়ে দিলেন ।’  

কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কে একটি চিঠিতে সুন্দর ভাবে লিখছেন তাঁর রেখার মায়ার ধরা পড়ার কথা –


 ‘পড়েছি আজ রেখার মায়ায়।
কথা ধনীঘরের মেয়ে,
অর্থ আনে সঙ্গে করে,
মুখরার মন রাখতে চিন্তা করতে হয় বিস্তর।
রেখা অপ্রগল্‌ভা, অর্থহীনা,
তার সঙ্গে আমার যে ব্যবহার সবই নিরর্থক।
গাছের শাখায় ফুল ফোটানো ফল ধরানো,
সে কাজে আছে দায়িত্ব;
গাছের তলায় আলোছায়ার নাট-বসানো
সে আর-এক কাণ্ড।’

কিম্বা –


‘এমনি করে, মনের মধ্যে
অনেকদিনের যে-লক্ষ্মীছাড়া লুকিয়ে আছে
তার সাহস গেছে বেড়ে।
সে আঁকছে, ভাবছে না সংসারের ভালোমন্দ,
গ্রাহ্য করে না লোকমুখের নিন্দাপ্রশংসা।’



কিন্তু ব্যাপারটা বোধহয় ঠিক এতটা সহজ নয় । আমরা বহুবার তাঁকে অস্থির হতে দেখেছি ।নিজেকে ভেঙ্গেছেন বারবার । এক জায়গায় থিতু হন নি কোন কালে । ছুটে বেড়িয়েছেন সুরুল থেকে রামগড় , কুষ্টিয়া থেকে মংপু । কি জানি কিসের সন্ধানে । নোবেল পুরস্কার পাবার কয়েক মাস পরেই তিনি নিজেকে এক জন ব্যর্থ মানুষ বলে রথী ঠাকুর কে চিঠি লিখছেন জীবনে কিছুই করা হল না । তাঁর কাছে সফলতার সংজ্ঞা টা ঠিক কি ছিল কে জানে । তাই ছবি আঁকার ইচ্ছের সঙ্গে অন্তত যশ লাভের আকাঙ্ক্ষার কোনো সম্পর্ক ছিলো না ।  
 গাছের তলার আলো ছায়ার নাট বসানো শুধু এক খেয়াল খেলা নয় । তার চেয়ে অধিক কিছু ।তিনি  গানে বলেছেন সীমার মাঝে অসীমের কথা । সে অসীম কে ধরতে যাওয়ার জন্যে রঙ তুলি কে আশ্রয় করার ভাবনা তাঁকে তাড়া করেছিল হয়ত । এক জায়গায় তিনি বলছেন – ‘ ছবিতে যে আনন্দ , সে হচ্ছে সুপরিমিতির আনন্দ – রেখার সংযমে সুনির্দিষ্ট কে সুপস্ট  করে দেখি – মন বলে ওঠে , নিশ্চিত দেখতে পেলুম ’

 এই সুনির্দিষ্টকে সুপস্ট করে দেখার  তাঁর এই অন্তরদৃস্টির বিশ্লেষণ করা আমাদের মত সাধারন মানুশের  পক্ষে তো সম্ভব হবই না । এমন কি গনেশ পাইন ও বলছেন -  রবীন্দ্রনাথের ছবি বিশ্লেষণ করা তাঁর সাধ্যাতীত ।
এমন করে পৃথিবীর কোন চিত্রী হয়ত ভাবেন নি । তাই তাঁর ছবি একান্ত ভাবে তাঁরই । তাঁর ছবির কোন ঘরানা তৈরি  হবেনা কোনোদিন । কোন ইজমএর ছকে ফেলা যাবেনা তাঁর ছবিকে। তবু তিনি অনন্য হয়েই থাকবেন চিরকাল ।
 সৃস্টির কোন তাড়না থেকে বয়সের ভার তুচ্ছ করে জীবনের সাঁঝ বেলায় এক নুতন আগুন জ্বালতে চেয়ে ছিলেন তিনি রঙ ও রেখায় , যে আগুন জ্বালা  তাঁর বিশাল বহুমুখী সাহিত্য সৃস্টির মধ্যেও অপূর্ণ থেকে গেছল , তা বুঝে ওঠা আমাদের পক্ষে হয়ত  কোনোদিন সম্ভব হবে  না । আমরা তাঁর এই মূর্ত থেকে বিমূর্ত আবার বিমূর্ত থেকে মূর্ততে যাওয়ার যাত্রা পথের দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকব চিরকাল।
কবি তাঁর ছবিকে verses in line  মানে রেখার কাব্য বলেছিলেন । নন্দলাল বোস তাঁর ছবিতে ছন্দের বিন্যাসের কথা বলেছেন ।

 কিন্তু অবন ঠাকুর ই তাঁর ছবি সম্মন্ধে সার কথাটি বলেছিলেন - ‘ও গুলো তো ছবি নয় , আগ্নেয় গিরির অগ্নুৎসার ।
    
  --------------------------------
















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন