অপু ‚ অপুর স্রষ্টা এবং তিনটি হিরন্ময় মুহুর্ত
********************************************
'ইসস‚ আপনি যে একটু লম্বা হয়ে গেলেন '| লেক টেম্পল রোডের ড্রইং রুমের ঢুকতেই পা জামা পাঞ্জাবী পরে সোফায় বসা ভদ্রলোকটির মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর থেকে নির্গত এই বাক্যটি ঘরে প্রবেশ করেছিল যে যুবকটি‚ তার মোটেই ভালো লাগেনি |
কারন বিভুতি ভুষনের অপরাজিত নিয়ে ছবি করা হবে শুনে যুবকটি এসেছিলেন পথের পাঁচালি ছবির সাড়া জাগনো পরিচালকের কাছে ‚ অভিনয় করার ইচ্ছে নিয়ে | গোটা বাংলাদেশের মানুষের মত যুবকটিও পথের পাঁচালি দেখে মুগ্ধ | তাই অপরাজিত তে রোল না পেয়ে হতাশ হলেন | কিন্তু আলাপ করে মুগ্ধ হলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে| অনেক কথা বার্তা হল | যুবকটি ফিরে গেলেন তার নিজের জীবনে | ইউনিভারসিটি ‚ কফিহাউসের আড্ডা ‚কবিতা লেখা ‚ মাঝে শিশির ভাদুড়ির বাড়িতে ঢুঁ মারা ‚ বই ধার করে পড়া | কিছুদিন পরে তার চাকরি হল অল ইন্ডিয়া রেডিও তে ‚ ঘোষকের চাকরী | আরও কিছুদিন পরে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু দিন গৃহবন্দী | তার পর আবার পরিচিত জীবনে ফিরে আসা|
এমন সময়ে হটাৎ কফি হাউসের আড্ডায় সুবীর হাজরা নামের এক সত্যজিৎ রায়ের সহকারী এসে খবর দিলো ‚ সত্যজিৎ রায় অপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন |
কয়েকদিন পর যুবকটি আবার হাজির হলেন লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে | ঘরে ঢুকতেই তিনি যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন - 'বাঃ ‚ সে রকম কিছু দাগ টাগ নেই তো মুখে ‚ যে টুকু আছে ও মিলিয়ে যাবে | আপনাকে কথা দিচ্ছিনা ‚ তবে বলে রাখছি ‚ আমি অপরাজিতর পরের অংশটি সিনেমা করবো বলে ঠিক করেছি | ওখানে আপনাকে কাজে লাগতে পারে | '
'এক কাজ করুন না আমি এখন দুটি ছবির এক সঙ্গে সুটিং করছি আপনি ওখানে চলে আসুন | '
তখন সুটিং চলছে দুটি সিনেমার - পরশ পাথর আর জলসাঘরের |যুবক টি রোজ সুটিংএ যায় | সুটিং দেখে ‚ কিছু কথাবার্তা হয় আর বড়ি ফিরে আসে |ছেলেটির কাছে এও এক বড় মানুষের খেয়াল বলেও মনে হয় | কিন্তু তবু খুব ভালো লাগে ঐ মানুষটির কাছাকাছি থাকতে |এমনি ভাবেই দিন কাটছিল| যুবকটি কিণ্চিৎ মনমরা হয়ে পড়েছেন কারন তিনি আর তাকে রোল দেওয়া নিয়ে কোনো কথা বলছেন না | এক দিন যুবক টি একটু হতাশ গলায় বললেন - আমি তাহলে আসি |
সত্যজিৎ বললেন -দাঁড়ান আপনার সঙ্গে ছবিদার আলাপ করিয়ে দিই ‚ আলাপ নেই নেই নিশ্চয় |
নিয়ে গেলেন সেই প্রবাদপ্রতিম ব্যাক্তিত্যের কাছে | ছবি বিশ্বাসের কাছে গিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন - ' ছবিদা ‚ এই হচ্ছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় - আমার পরের ছবি অপুর সংসারের নায়ক |'
যেন স্বর্গ থেকে আকাশবাণী হল| বংশীচন্দ্র গুপ্তের তৈরি জলসাঘরের অসাধারন সেটের ঝাড় লন্ঠনগুলো যেন একটু বেশি করে দুলতে লাগলো | আর কিছুই কানে যাচ্ছে না তার | পা যেন মাটিতে আর ঠেকছে না |
অপুর সংসারে অপু হবে সে ‚ যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না |
এই হল আমাদের প্রথম হিরন্ময় মুহুর্ত |
******************************
অপুর সংসারের সুটিং হতে কয়েক দিন বাকি | কিন্তু মানিকদার কাছে সৌমিত্রর আসা যাওয়া চলছে | গল্প গুজব হয় নানা বিষয় নিয়ে | তার মধ্যে সিনেমা তো আছেই | একদিন হটাৎ বললেন তুমি Lost weekendদেখেছ | সৌমিত্রর উত্তর আজ্ঞে না | এই রবিবারে আমরা বসুশ্রী তে ছবিটা দেখবো | ভালো করে Ray Miland এর অভিনয় লক্ষ করবে | সিনেমায় অভিনয় কেমন হওয়া উচিত বুঝতে পারবে |
এ ভাবেই অপুর প্রস্তুতি চলছিল | সেই সঙ্গে সিনেমার বই পড়া শোনাও চলছিল‚ যেমন স্ত্লানিশাভস্কির An actor prepares |
একদিন মানিক দা তাঁর স্ক্রিপ্টের একটা অংশ পড়তে দিলেন | তখন তিনি ইংরেজী তে টাইপ করে স্ক্রিপ্ট লিখতেন |
বাড়িতে নিয়ে এসে স্ক্রিপ্ট পড়তে বসেই মজে গেলেন সৌমিত্র |
শেষ দৃশ্য ‚ যেখানে কাজল কে কাঁধে নিয়ে অপু কোলকাতা ফিরে যাচ্ছে |পাশে নদী বয়ে যাচ্ছে |তাতে নৌকো ভাসছে | ওখানে স্ক্রিপ্ট বলছে -
faces .......
Where despair has given away to hope
and bitterness to love...
And the river flows on ......
এমন সব লাইন গোটা স্ক্রিপ্ট জুড়ে ছড়িয়ে যা অভিনেতা কে ভাবাবে ‚ ভিতর থেকে আপনিই বার করে আনবে আবেগ |
অপু ঢুকে পড়লো সৌমিত্রর ভিতর | একটু করে বাড়তে লাগলো অপু | মানিক দা আর একটা কাজ করলেন | সৌমিত্র কে দু পাতা নোট লিখে দিলেন | তাতে বুঝিয়ে লেখা অপুর মত এক জন শিক্ষিত আধুনিক যুবক কেন অপর্ণা কে বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল সেদিন| এটা পড়ে অপু আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো | যেন সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছে সৌমিত্র |
তারিখ ৯ই আগস্ট ১৯৫৮| প্রথম শট নেওয়া হবে সৌমিত্রর |
বেলেঘাটা অঞ্চলের একটি বটলিং প্লান্ট | তখন সি আই টি রোডের জন্ম হয় নি | অপু একটি ছাতা বগলে করে প্লান্টে ঢুকছে ‚ চারি দিকে তাকাচ্ছে | যারা কাজ করছে তাদের ভাবলেষহীন মুখ - যেন যন্ত্রের অংশ | অপুর মুখে ফুটে উঠছে এক ধরনের অনুভুতি | যা বলে দিচ্ছে ‚ সে যতই হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজুক ‚ এই কাজ সে করতে পারবে না | মানিক দা ক্যামেরায় চোখ রেখে সৌমিত্র কে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন | এক সময়ে সেই ব্যারিটোন চেঁচিয়ে বললেন- ‚ excellent , OK .
সৌমিত্রর জীবনের প্রথম শটটি একটি টেকেই ক্যামেরা বন্দী হল |
আর আমাদের দ্বিতীয় হিরন্ময় মুহুর্তটি সৃষ্টি হল |
********************************
তখনো অপুর সংসারের সুটিং চলছে | ক্যামেরাম্যান সত্যেন চ্যাটারজি এসে খবর দিলেন বেলেঘাটায় চন্দ্রগুপ্ত নাটক হবে ‚ তাতে শিশির কুমার ভাদুড়ি চানক্যর অভিনয় করবেন | মানিক দা সৌমিত্র কে বললেন - দেখ তো যাওয়া যায় কি না |
সৌমিত্র জানতেন শো টির কথা | ব্যাবস্থা করে ফেললেন | নির্দিষ্ট দিনে মানিক দা একটি টাক্সিতে চেপে ( তখনো গাড়ি কেনা হয় নি দু জনের একজনেরও ) হাজির হলেন সৌমিত্র কে তুলে নিতে | পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবী আর ঢোলা পাজামা |
হলে পৌঁছে সৌমিত্র খবর দিলেন শিশির বাবুকে - সত্যজিৎ রায় এসেছেন | শিশির বাবু তাঁকে নিয়ে আসতে বললেন | শিশির বাবু একটি ক্যাম্প চেয়ারে বসে | মানিক দা বসলেন পাশে একটি খাটের উপর |সৌমিত্র বসলেন দু জনের মাঝখানে| দু জনে আলাপচারীতা চলছে | এমন সময়ে এক অতি উৎ্সাহী ছেলে ঢুকে পড়ে একটি অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে | প্রথমে শিশির বাবুর অটোগ্রাফ নেওয়ার অনুরোধ | মানিক দার সামনে বলেই বোধহায় তিনি আপত্তি নাকরে অটোগ্রাফ দিয়েই দিলেন | এর পর ছেলেটি অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিলেন সত্যজিৎ রায়ের দিকে | তিনি বিশেষ আপত্তি করেন না | দিয়ে দিলেন | এর পর ছেলেটি খাতাটি বাড়িয়ে দিলেন সৌমিত্রর দিকে | সৌমিত্রর হটাৎ মনে হল বেলেঘাটার সেই হলের মেঝের ডিজাইন টা খুব অন্যরকম ‚ খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন | ভেবেছিলেন ছেলেটি নিজেই চলে যাবে | সে তখনো এক অপরিচিত মুখ | আর দু পাশে তার দুই গুরু বসে আছেন | মানিক দা ব্যাপারটা লক্ষ করে একটু দুষ্টু দুষ্টু হাসি হাসছিলেন | ‚ শিশিরবাবুও লক্ষ করেছিলেন সৌমিত্রর লজ্জা পাওয়া | বললেন এ কি সৌমিত্র তুমি অটোগ্রাফ দিচ্ছ না কেন ?
মানিক দা বলে উঠলেন দিয়ে দাও সৌমিত্র ‚ আর এখন থেকে ওটা দেওয়া practice করো | এখন থেকে অনেক বার দিতে হবে |
আর এড়ানো গেল না| সৌমিত্র তার জীবনের দুই প্রধান গুরু কে দু পাশে রেখে দিলেন তার জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ |
আর এটাই আমাদের তৃতীয় হিরন্ময় মুহুর্ত |
************************
বাইশ বছর পেরিয়ে গেছে‚ সত্যজিৎ রায় আর ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে কোনো নতুন শটের জন্যে লুক থ্রু করেন নি | Roland সিন্থাসাইজরে বসে নতুন কোনো স্টাফ নোটেশন লেখেন নি | লাল কাপড়ে মোড়া খেরো খাতায় কোনো নতুন চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করেন নি | কোনো গল্প খোঁজেন নি ‚ গল্প লেখেন নি |
বাইশ বছরে দুনিয়াটা বড় বেশি বদলে গেছে | এক আন্তর্জালই আমাদের অনেক কিছু ওলট পালট করে দিয়েছে |আমরা বদলেছি ভিতরে বাইরে |আমাদের দেখা বদলে গেছে ‚ শোনা বদলে গেছে ‚ ভাবা বদলে গেছে |
তবু সব বদলের ঝড় পেরিয়ে কি জানি কেন আমরা সেই অপুকে বহন করে নিয়ে চলেছি ‚ অস্তিত্বের অভ্যন্তরে | সেই প্রথম ট্রেন দেখার বিস্ময় ‚ যাত্রাপালা দেখে রাজা হবার ইচ্ছে ‚ অজ পাড়া গাঁয়ের মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে ‚ হাতে গ্লোব নিয়ে ‚ নতুন করে পথ খোঁজার শপথ নেওয়া ‚ আর সেই শিশুপুত্র কে কাঁধে নিয়ে ধংসস্তুপ থেকে আবার নতুন জীবনস্রোতের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া - এই সব নিয়ে অপু আছে আমাদের হাড়ে মজ্জায় | সুপারম্যান হিরো ‚ স্পেশাল এফেক্টস ‚ ডিজিটাল ছবি ‚ ডলবি সাউন্ড এই সব জাঁক জমকের মধ্যে আমাদের অপু কি হারিয়ে যাবে ?
নাকি দিন যতই বদলাক ‚ সেই দীর্ঘদেহী মানুষটি ‚ সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে দীর্ঘতর হয়ে উঠবেন আর সেই নদীটা বহমান থাকবে চিরকাল |
.........Where despair has given away to hope
and bitterness to love...
And the river flows on ...... |
***********
১৯৫৯ সালে ঠিক আজকের দিনে ‚ মানে 1st May 1959 তারিখে কোলকাতায় অপুর সংসার ছবিটি রিলিজ করেছিল| আর কাল তার স্র্ষ্টার জন্মদিন | দুটো দিনকে মনে রেখেই আমার এই সেলাম |
********************************************
'ইসস‚ আপনি যে একটু লম্বা হয়ে গেলেন '| লেক টেম্পল রোডের ড্রইং রুমের ঢুকতেই পা জামা পাঞ্জাবী পরে সোফায় বসা ভদ্রলোকটির মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর থেকে নির্গত এই বাক্যটি ঘরে প্রবেশ করেছিল যে যুবকটি‚ তার মোটেই ভালো লাগেনি |
কারন বিভুতি ভুষনের অপরাজিত নিয়ে ছবি করা হবে শুনে যুবকটি এসেছিলেন পথের পাঁচালি ছবির সাড়া জাগনো পরিচালকের কাছে ‚ অভিনয় করার ইচ্ছে নিয়ে | গোটা বাংলাদেশের মানুষের মত যুবকটিও পথের পাঁচালি দেখে মুগ্ধ | তাই অপরাজিত তে রোল না পেয়ে হতাশ হলেন | কিন্তু আলাপ করে মুগ্ধ হলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে| অনেক কথা বার্তা হল | যুবকটি ফিরে গেলেন তার নিজের জীবনে | ইউনিভারসিটি ‚ কফিহাউসের আড্ডা ‚কবিতা লেখা ‚ মাঝে শিশির ভাদুড়ির বাড়িতে ঢুঁ মারা ‚ বই ধার করে পড়া | কিছুদিন পরে তার চাকরি হল অল ইন্ডিয়া রেডিও তে ‚ ঘোষকের চাকরী | আরও কিছুদিন পরে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু দিন গৃহবন্দী | তার পর আবার পরিচিত জীবনে ফিরে আসা|
এমন সময়ে হটাৎ কফি হাউসের আড্ডায় সুবীর হাজরা নামের এক সত্যজিৎ রায়ের সহকারী এসে খবর দিলো ‚ সত্যজিৎ রায় অপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন |
কয়েকদিন পর যুবকটি আবার হাজির হলেন লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে | ঘরে ঢুকতেই তিনি যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন - 'বাঃ ‚ সে রকম কিছু দাগ টাগ নেই তো মুখে ‚ যে টুকু আছে ও মিলিয়ে যাবে | আপনাকে কথা দিচ্ছিনা ‚ তবে বলে রাখছি ‚ আমি অপরাজিতর পরের অংশটি সিনেমা করবো বলে ঠিক করেছি | ওখানে আপনাকে কাজে লাগতে পারে | '
'এক কাজ করুন না আমি এখন দুটি ছবির এক সঙ্গে সুটিং করছি আপনি ওখানে চলে আসুন | '
তখন সুটিং চলছে দুটি সিনেমার - পরশ পাথর আর জলসাঘরের |যুবক টি রোজ সুটিংএ যায় | সুটিং দেখে ‚ কিছু কথাবার্তা হয় আর বড়ি ফিরে আসে |ছেলেটির কাছে এও এক বড় মানুষের খেয়াল বলেও মনে হয় | কিন্তু তবু খুব ভালো লাগে ঐ মানুষটির কাছাকাছি থাকতে |এমনি ভাবেই দিন কাটছিল| যুবকটি কিণ্চিৎ মনমরা হয়ে পড়েছেন কারন তিনি আর তাকে রোল দেওয়া নিয়ে কোনো কথা বলছেন না | এক দিন যুবক টি একটু হতাশ গলায় বললেন - আমি তাহলে আসি |
সত্যজিৎ বললেন -দাঁড়ান আপনার সঙ্গে ছবিদার আলাপ করিয়ে দিই ‚ আলাপ নেই নেই নিশ্চয় |
নিয়ে গেলেন সেই প্রবাদপ্রতিম ব্যাক্তিত্যের কাছে | ছবি বিশ্বাসের কাছে গিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন - ' ছবিদা ‚ এই হচ্ছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় - আমার পরের ছবি অপুর সংসারের নায়ক |'
যেন স্বর্গ থেকে আকাশবাণী হল| বংশীচন্দ্র গুপ্তের তৈরি জলসাঘরের অসাধারন সেটের ঝাড় লন্ঠনগুলো যেন একটু বেশি করে দুলতে লাগলো | আর কিছুই কানে যাচ্ছে না তার | পা যেন মাটিতে আর ঠেকছে না |
অপুর সংসারে অপু হবে সে ‚ যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না |
এই হল আমাদের প্রথম হিরন্ময় মুহুর্ত |
******************************
অপুর সংসারের সুটিং হতে কয়েক দিন বাকি | কিন্তু মানিকদার কাছে সৌমিত্রর আসা যাওয়া চলছে | গল্প গুজব হয় নানা বিষয় নিয়ে | তার মধ্যে সিনেমা তো আছেই | একদিন হটাৎ বললেন তুমি Lost weekendদেখেছ | সৌমিত্রর উত্তর আজ্ঞে না | এই রবিবারে আমরা বসুশ্রী তে ছবিটা দেখবো | ভালো করে Ray Miland এর অভিনয় লক্ষ করবে | সিনেমায় অভিনয় কেমন হওয়া উচিত বুঝতে পারবে |
এ ভাবেই অপুর প্রস্তুতি চলছিল | সেই সঙ্গে সিনেমার বই পড়া শোনাও চলছিল‚ যেমন স্ত্লানিশাভস্কির An actor prepares |
একদিন মানিক দা তাঁর স্ক্রিপ্টের একটা অংশ পড়তে দিলেন | তখন তিনি ইংরেজী তে টাইপ করে স্ক্রিপ্ট লিখতেন |
বাড়িতে নিয়ে এসে স্ক্রিপ্ট পড়তে বসেই মজে গেলেন সৌমিত্র |
শেষ দৃশ্য ‚ যেখানে কাজল কে কাঁধে নিয়ে অপু কোলকাতা ফিরে যাচ্ছে |পাশে নদী বয়ে যাচ্ছে |তাতে নৌকো ভাসছে | ওখানে স্ক্রিপ্ট বলছে -
faces .......
Where despair has given away to hope
and bitterness to love...
And the river flows on ......
এমন সব লাইন গোটা স্ক্রিপ্ট জুড়ে ছড়িয়ে যা অভিনেতা কে ভাবাবে ‚ ভিতর থেকে আপনিই বার করে আনবে আবেগ |
অপু ঢুকে পড়লো সৌমিত্রর ভিতর | একটু করে বাড়তে লাগলো অপু | মানিক দা আর একটা কাজ করলেন | সৌমিত্র কে দু পাতা নোট লিখে দিলেন | তাতে বুঝিয়ে লেখা অপুর মত এক জন শিক্ষিত আধুনিক যুবক কেন অপর্ণা কে বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল সেদিন| এটা পড়ে অপু আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো | যেন সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছে সৌমিত্র |
তারিখ ৯ই আগস্ট ১৯৫৮| প্রথম শট নেওয়া হবে সৌমিত্রর |
বেলেঘাটা অঞ্চলের একটি বটলিং প্লান্ট | তখন সি আই টি রোডের জন্ম হয় নি | অপু একটি ছাতা বগলে করে প্লান্টে ঢুকছে ‚ চারি দিকে তাকাচ্ছে | যারা কাজ করছে তাদের ভাবলেষহীন মুখ - যেন যন্ত্রের অংশ | অপুর মুখে ফুটে উঠছে এক ধরনের অনুভুতি | যা বলে দিচ্ছে ‚ সে যতই হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজুক ‚ এই কাজ সে করতে পারবে না | মানিক দা ক্যামেরায় চোখ রেখে সৌমিত্র কে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন | এক সময়ে সেই ব্যারিটোন চেঁচিয়ে বললেন- ‚ excellent , OK .
সৌমিত্রর জীবনের প্রথম শটটি একটি টেকেই ক্যামেরা বন্দী হল |
আর আমাদের দ্বিতীয় হিরন্ময় মুহুর্তটি সৃষ্টি হল |
********************************
তখনো অপুর সংসারের সুটিং চলছে | ক্যামেরাম্যান সত্যেন চ্যাটারজি এসে খবর দিলেন বেলেঘাটায় চন্দ্রগুপ্ত নাটক হবে ‚ তাতে শিশির কুমার ভাদুড়ি চানক্যর অভিনয় করবেন | মানিক দা সৌমিত্র কে বললেন - দেখ তো যাওয়া যায় কি না |
সৌমিত্র জানতেন শো টির কথা | ব্যাবস্থা করে ফেললেন | নির্দিষ্ট দিনে মানিক দা একটি টাক্সিতে চেপে ( তখনো গাড়ি কেনা হয় নি দু জনের একজনেরও ) হাজির হলেন সৌমিত্র কে তুলে নিতে | পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবী আর ঢোলা পাজামা |
হলে পৌঁছে সৌমিত্র খবর দিলেন শিশির বাবুকে - সত্যজিৎ রায় এসেছেন | শিশির বাবু তাঁকে নিয়ে আসতে বললেন | শিশির বাবু একটি ক্যাম্প চেয়ারে বসে | মানিক দা বসলেন পাশে একটি খাটের উপর |সৌমিত্র বসলেন দু জনের মাঝখানে| দু জনে আলাপচারীতা চলছে | এমন সময়ে এক অতি উৎ্সাহী ছেলে ঢুকে পড়ে একটি অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে | প্রথমে শিশির বাবুর অটোগ্রাফ নেওয়ার অনুরোধ | মানিক দার সামনে বলেই বোধহায় তিনি আপত্তি নাকরে অটোগ্রাফ দিয়েই দিলেন | এর পর ছেলেটি অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিলেন সত্যজিৎ রায়ের দিকে | তিনি বিশেষ আপত্তি করেন না | দিয়ে দিলেন | এর পর ছেলেটি খাতাটি বাড়িয়ে দিলেন সৌমিত্রর দিকে | সৌমিত্রর হটাৎ মনে হল বেলেঘাটার সেই হলের মেঝের ডিজাইন টা খুব অন্যরকম ‚ খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন | ভেবেছিলেন ছেলেটি নিজেই চলে যাবে | সে তখনো এক অপরিচিত মুখ | আর দু পাশে তার দুই গুরু বসে আছেন | মানিক দা ব্যাপারটা লক্ষ করে একটু দুষ্টু দুষ্টু হাসি হাসছিলেন | ‚ শিশিরবাবুও লক্ষ করেছিলেন সৌমিত্রর লজ্জা পাওয়া | বললেন এ কি সৌমিত্র তুমি অটোগ্রাফ দিচ্ছ না কেন ?
মানিক দা বলে উঠলেন দিয়ে দাও সৌমিত্র ‚ আর এখন থেকে ওটা দেওয়া practice করো | এখন থেকে অনেক বার দিতে হবে |
আর এড়ানো গেল না| সৌমিত্র তার জীবনের দুই প্রধান গুরু কে দু পাশে রেখে দিলেন তার জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ |
আর এটাই আমাদের তৃতীয় হিরন্ময় মুহুর্ত |
************************
বাইশ বছর পেরিয়ে গেছে‚ সত্যজিৎ রায় আর ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে কোনো নতুন শটের জন্যে লুক থ্রু করেন নি | Roland সিন্থাসাইজরে বসে নতুন কোনো স্টাফ নোটেশন লেখেন নি | লাল কাপড়ে মোড়া খেরো খাতায় কোনো নতুন চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করেন নি | কোনো গল্প খোঁজেন নি ‚ গল্প লেখেন নি |
বাইশ বছরে দুনিয়াটা বড় বেশি বদলে গেছে | এক আন্তর্জালই আমাদের অনেক কিছু ওলট পালট করে দিয়েছে |আমরা বদলেছি ভিতরে বাইরে |আমাদের দেখা বদলে গেছে ‚ শোনা বদলে গেছে ‚ ভাবা বদলে গেছে |
তবু সব বদলের ঝড় পেরিয়ে কি জানি কেন আমরা সেই অপুকে বহন করে নিয়ে চলেছি ‚ অস্তিত্বের অভ্যন্তরে | সেই প্রথম ট্রেন দেখার বিস্ময় ‚ যাত্রাপালা দেখে রাজা হবার ইচ্ছে ‚ অজ পাড়া গাঁয়ের মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে ‚ হাতে গ্লোব নিয়ে ‚ নতুন করে পথ খোঁজার শপথ নেওয়া ‚ আর সেই শিশুপুত্র কে কাঁধে নিয়ে ধংসস্তুপ থেকে আবার নতুন জীবনস্রোতের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া - এই সব নিয়ে অপু আছে আমাদের হাড়ে মজ্জায় | সুপারম্যান হিরো ‚ স্পেশাল এফেক্টস ‚ ডিজিটাল ছবি ‚ ডলবি সাউন্ড এই সব জাঁক জমকের মধ্যে আমাদের অপু কি হারিয়ে যাবে ?
নাকি দিন যতই বদলাক ‚ সেই দীর্ঘদেহী মানুষটি ‚ সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে দীর্ঘতর হয়ে উঠবেন আর সেই নদীটা বহমান থাকবে চিরকাল |
.........Where despair has given away to hope
and bitterness to love...
And the river flows on ...... |
***********
১৯৫৯ সালে ঠিক আজকের দিনে ‚ মানে 1st May 1959 তারিখে কোলকাতায় অপুর সংসার ছবিটি রিলিজ করেছিল| আর কাল তার স্র্ষ্টার জন্মদিন | দুটো দিনকে মনে রেখেই আমার এই সেলাম |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন