তখন কে তুমি তা কে জানতো ............
**************************
আমার সেই বিহানবেলার কথা । আমি তখন এতই ছোট যে বাড়ির বড়রা কোনো ব্যাপারেই আমাকে মনুষ্যপদবাচ্য মনে করত না।সব জায়গায় আমি দুধুভাতু । বাড়িতে মা বাবা দাদা বউদি দিদি মিলে প্রচুর লোক । আমি আর আমার পিঠোপিঠি এক দাদা , দুজন ছিলাম বাড়ি সুদ্ধ লোকের দাদাগিরি , দিদিগিরি ফলানোর সফট টারগেট । বাড়িতে মাঝে মাঝেই সবাই মিলে আড্ডা জমত নানা বিষয়ে, আমরা গুটি গুটি সেখানে গিয়ে জুটলেই কেও না কেও ঠিক বলে উঠত – তোরা এখানে কি করছিস , যা পড়তে বোস ।
এই সম্মিলিত অবহেলার বিরুদ্ধে আমরা মাঝে মাঝে গর্জে উঠতাম । কিন্তু প্রতিপক্ষ অনেক বেশি শক্তিশালী । তারা নির্বিচারে দমননীতি প্রয়োগ করতো । এবং আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য হতাম । কিন্তু মনে মনে কোথাও একটা বিদ্রোহ দানা বাঁধত ।
অগত্যা আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন না গেয়ে দুস্টুমির ফন্দি ফিকির খুঁজে বেড়াতাম ।
এমনি সময়ে মনে আছে ,আমার মেজদার পরিচালনায় আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের মহড়া চলত । রবীন্দ্রনাথ তখন আমাদের কাছে পাঠ্য পুস্তকে পড়া -‘ অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি’ কবিতাটির লেখক এবং একজন ধবধবে সাদা দাড়ি গোঁফে মুখ ঢাকা ছবির মানুষের বেশি কিছু নয় ।মহড়া হত বিকেল বেলায় । আমাদের বসবার ঘরের সামনে চটি জুতোয় ভরে যেত । যথারীতি সে খানে আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল না । অথচ সেই সময়টা মোটেই আমাদের পড়তে বসার সময় নয় । অগত্যা মহড়ার সময় আমরা বাড়ির বাইরে বেড়া দেওয়া ছোট্টো বাগানে কিছু না কিছু নিয়ে খেলতাম । আমরা লক্ষ করলাম অনেক গানের মধ্যে একটি কোরাস গানে একটি লাইন আছে – ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো ও ও ও , আগুন জ্বালো ও ও --- । আমরা একটা কাজ পেলাম । এই গানটি শুরু হলেই আমরা বাগানের যত শুকনো পাতা এক জায়গায় জড় কোরে রাখতাম । আগুন জ্বালো—ওওও শুনলেই আমাদের একশন শুরু হয়ে যেত । ‘ব্যর্থ প্রাণ’ ব্যপারটা ঠিক কাকে বলে তা জানা ছিল না , তবে সেটা এক ধরনের দাহ্য পদার্থ তাতে কোনো সন্দেহ ছিলো না । দিনের আলো নিভে আসা সন্ধের মুখে ওই সম্মিলিত সুরে ‘আগুন জ্বালো’ গানের সঙ্গে শুকনো পাতা গুলো দাও দাও করে জ্বলে ওঠা এই দুই মিলে বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার হত । কিছু যেন একটা ঘটে যেত আমাদের মনে মনে । ‘ব্যর্থ প্রানের’ অভাবে ওই শুকনো পাতাগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে হয়ত আমাদের একটা প্রতিবাদ ছিল । যত দূর মনে পড়ে সেই প্রতিবাদের মধ্যে দিয়েই আমার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম এনকাউন্টার ।
*******
আমাদের শিল্প শহর টি ছিল প্রকৃত অর্থে কসমোপলিটান । আমাদের কলোনি টির এক একটি রাস্তা ভারতবর্ষের এক একটি নদীর নামে ছিল । যমুনা , গন্ধক , পালা , জোহিলা , ওয়ারধা ইত্যাদি । তেমনি এক একটি বাড়িতে এক এক প্রদেশের মানুষ ও থাকতেন ।তাই আমরা রামনবমী , পঙ্গাল , ছট পুজো , গনেশ চতুর্থী , ঈদ , ক্রিসমাস সব কিছুরই কিছু কিছু আঁচ পেতাম আমাদের ওয়ারধা রোডের বাড়িতে বসে । কখনো কখনো পড়শীদের কাছ থেকে নেমতন্ন আসত ঈদের সেমাই খাবার , ছট পুজোর ঠেকুয়া খাবার , সরস্বতী পুজোর গোটা সেদ্ধ খাবার , দীয়ালির লাড্ডু খাবার । কখনো কারো বাড়ি থেকে , কখনো দূর থেকে ভেসে আসা মাইক্রোফোনে কানে আসতো কাওয়ালি – হামে তো লুঠ লিয়া মিলকে হুস্ন ওয়ালো নে , কালি কালি বালো নে গোরে গোরে গাল নে । তেমনি ইংরেজী গান শুনতে পেতাম কে সারা সারা/ হোয়াট এভার উইল বি উইল বি । আবার কখনো ভাংড়া গান , - কি ম্যায় ঝুট বোলিয়া , কোই না , ভাই কোই না, কখন বা হোলির সময় ঢোলক খঞ্জনি বাজিয়ে সমস্বরে ভোজপুরী গান । দূর থেকে ভেসে আসা সে সব গানের তাল ও সুরের ঝাকুনি আমাকে দুলিয়ে দিত । আমি কোলাহল আর গানের মধ্যে তফাত করাতে শিখছিলাম নিজে নিজেই ।
বাড়িতে একটা রেডিও ছিল । কিন্তু সেটা চালানর অধিকার তখন পাইনি । ওটা দাদারা চালাতেন । এক দাদা নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সর্ট ওয়েবে বিনাকা গীতমালা শুনতেন । আমিন সায়ানির উপস্থাপনায় সপ্তাহের সব হিট গান বাজাত । খোয়া খোয়া চাঁদ , ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি ফির কঁহা , ম্যায় রঙ্গিলা প্যার কা রাহী , যো ওয়াদা কিয়া হ্যায় নিভানা পড়েগা ইত্যাদি টুকরো টুকরো গানের কলি অঙ্ক কসতে কসতে কানে ভেসে আসত । রবীন্দ্রনাথ তখনও আমার কাছে অনাগত । শত বর্ষ উদযাপনের আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্ত সব শহরে গ্রামে গঞ্জে – আজকের মত ‘তোমাদেরি লোক ‘ বলে খ্যাত হয়ে উঠতে পারেন নি । বিশেষ করে বিহারের এক শিল্প শহরে বেড়ে ওঠা বালকের কাছে রবীন্দ্রনাথের পৌঁছোন টা ত বেশ দুস্করই ছিল ।
আমার মেজদা ছিলেন একজন আপাদমস্তক সংস্কৃতিবান এবং রবীন্দ্রনাথ-আশ্রিত মানুষ ছিলেন।কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ সবই লিখতেন । সেই বয়সে অবশ্য সে সব বুঝবার ক্ষমতা আমার ছিল না । তিনি আমার চেয়ে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের বড় ।তাই আমার শৈশবে তিনি যুবক । মেজদা এক অননুকরণীয় ভঙ্গীতে গল্প বলতে পারতেন । যে কোনো গল্পই তাঁর বলার ভঙ্গীতে একেবারে চলচ্চিত্র হয়ে উঠত আমাদের কাছে । সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ।সে সময় আমাদের পাড়া এবং আশে পাশের অঞ্চলের যে কোন বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পুরধা হতেন মেজদা ।
একবার জানতে পারলাম মেজদা কাবুলিওয়ালা বলে একটি নাটক করাবেন । আরও জানতে পারলাম সে নাটক আসলে রবীন্দ্রনাথের একটি গল্প থেকে মেজদার নাট্যরুপ । সে নাটকে অভিনয় করবে মিনির ভুমিকায় আমাদের পাশের বাড়ির রেখাদি , কাবুলিওয়ালার ভুমিকায় আমার ছোটদা আর মিনির বাবার ভুমিকায় স্বয়ং মেজদা । মনে আছে , কাবুলিওয়ালার পোশাক জোগাড় করা একটা সমস্যা হয়েছিল । আমাদের পাড়ায় আসা যাওয়া করত সত্যিকারের এক কাবুলিওয়ালা । সুদ কিস্তির ব্যাবসা করতে । তাকে বলে কয়ে তার পোশাক ধার করা হয়েছিল । তার জন্যে সে কিছু সুদ আদায় করেছিল কিনা তা আজ আর মনে নেই । তবে নাটক দিব্যি জমে উঠেছিল । মাসিমা কাকিমারা নাটক দেখে প্রচুর অশ্রু বিসর্জন করে ছিলেন আর এর পর রেখাদি কে সবাই মিনি বলেই ডাকতো। আর আমি জানতে পারলাম রবীন্দ্রনাথ গান বানান , কবিতা লেখেন আবার গল্প ও লিখেছেন ।
সাল্ টা ঠিক মনে নেই । তবে ১৯৫৭ সালে তপন সিনহা কাবুলিওয়ালা ছবিটি করেন । এটা তার আগের ঘটনা ।
এর আগে কেউ কাবুলিওয়ালা গল্পের নাট্যরুপ অন্য কেউ দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই ।
কিছুদিন পরে মেজদার বিয়ে হল । যত টুকু মনে পড়ে সেদিন প্রবল বর্ষণ হয়ে চারিদিকে জল জমে গিয়েছিল । আর কানাঘুসো আমার কানে এসেছিল আমরা নাকি আগ মার্কা ঘটি কিন্তু মেজোবউদি কট্টর বাঙ্গাল বাড়ির মেয়ে। তখন কার দিনে সমন্ধ করে ঘটি বাঙ্গালের বিয়ে খুব স্বাভাবিক ছিল না ।এটা নিয়ে আত্নীয় সজন রা ঈষৎ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এটা আমার পিতা ঠাকুরের নির্ণয় ছিল । তিনি সম্ভবত মেজবউদির গান শুনেই অন্য সবাইকার ওজর আপত্তি তুচ্ছ করে এই সিধান্ত নিয়ে ছিলেন ।
মেজবউদি আসার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে গান যেন জীবন্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো সুগন্ধী ধুপের গন্ধের মত । তখন তো আর জানতাম না কান্ত বাবুর ক্ল্যারিওনেট বাঁশি থেকে বেরনো সুর কেমন করে কিনু গোয়ালার গলির সমস্ত আকাশে অনাদী কালের বিরহ বেদনা ছড়িয়ে দেয় । কিন্তু আমাদের ২৪ নম্বর ওয়ারাধা রোডের বাড়িতে মেজ বউদি গান ধরলে তেমনি একটা কিছু হোতো । এ গান রেডিও তে বা মাইকে বাজা গানের মত নয় । হারমনিয়াম সঙ্গে গলার আওয়াজ মিলে গান গুলো যেন আমার কানের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে খুলতে চেস্টা কোরতো এতকালের অনুদ্ঘাটিত একটা চোরা কুঠুরি যেখানে লুকিয়ে রাখা থাকত আমার একান্ত নিজের কিছু অদ্ভুত সব কষ্ট ।
তখন গান ব্যাপারটা তো এত অনায়াসে পাওয়ার মত ধন ছিল না । ইচ্ছে অনিচ্ছায় আজকের মত গান মানুষের কানে উপযাচক হয়ে ঢুকে পড়তো না ।
পাড়ার মহিলারা অনেকেই গান শুনতে চলে আসতো সময় অসময়ে ।
প্রেম মুদিত মনসে কহো রাম রাম রাম , হরি হরি সুমিরন করো এই সব ভজন গাইতেন পাড়ার দিদিমা ঠাকুমাদের অনুরোধে । আবার একটু আধুনি্ক কাকিমা-জেঠিমাদের অনুরোধে গাইতেন ‘ রুপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরুপ রতন আশা করে ‘
অরুপ-রতনের সন্ধান তো আজও পাওয়া হোলোনা । তবে সন্ধান শুরু বোধহয় হয়েছিল সেই গান শোনার পর থেকেই ।
মেজদা অফিস থেকে ফিরে আসার পর ওদের ভেজানো দরজার ওপার থেকে দুজনের মিলিত কন্ঠে শোনা যেত – আমি তোমারো সঙ্গে বেঁধেছি আমারো প্রাণ , সুরের বাঁধনে ‘
একটু করে বুঝতে পারছিলাম রবীন্দ্রসঙ্গীত নাম দেওয়া গান গুলো একটু যেন অন্য রকম । সোজাসুজি কিছু বলে দেওয়া নয় । অথচ কিছু বলবার ইচ্ছেটাকে চাগিয়ে দেওয়া । আর কিছু কিছু শব্দ যার মানে পুরোপুরি বোঝা যায় না কিন্তু তবু বুঝবার প্রবল ইচ্ছে হয় ।
তখন বিয়েবাড়িতে উপহার দেওয়ার পালা টা সেরে দেওয়া হত মোটামুটি দু রকমের জিনিষ দিয়ে – সাড়ি আর বই । আর বইয়ের মধ্যে সব চেয়ে বেশি পড়ত ‘সঞ্চয়িতা’ । কারন ওটা বেশ সস্তায় পুস্টিকর বস্তু ।
মেজদার বিয়েতে একাধিক সঞ্চয়িতা পড়েছিল । তার একটা কি করে যেন আমার কাছেও পৌঁছে গেছল ।
এর আগে কোনো একটি অনুষ্ঠানে একজন আমার থেকে কিছু বড় একটি ছেলেকে খুব গলা খুলে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে শুনে ছিলাম । কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিয়েছিল । সেই কবিতাটাই খুঁজে বের করলাম । কবিতার নাম নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ
পড়তে পড়তে শরীরে যেন কেমন একটা ঢেউ খেলে গেল । অনেক অচেনা শব্দ । কিন্তু ছন্দ টা যেন ছাব্বিসে জানুয়ারি তে টাটা কোম্পানির সান্ত্রীদের কুচকাওয়াজের ড্রামের বাজনা । আরো একটু পড়তে পড়তে মনে হোলো একটা খোলস যেন আমাকে চেপে ধরতে চাইছে , আর হাত পা ছুঁড়ছি সে খোলসটা কে ছিঁড়ে ফেলার জন্যে ।
এও তো একটা বিদ্রোহ । সেই আগুন জ্বালো -আগুন জ্বালো গানটায় যে বিদ্রোহ ছিল সেটার সঙ্গে যেন কথাও একটা মিল আছে যেন । রবি ঠাকুর তা হলে ছবি তে যে রকম প্রশান্ত মুখে দেখা যায় , সে রকম মোটেই নন ।
হ্যাঁ , আমার সেই বিহান বেলায় রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহ হয়েই এলেন আমার কাছে ।
তার পর যত বেলা গড়িয়েছে , অনেক বার চেহারা পাল্টে পাল্টে এসেছেন আমার কাছে ।তারপর একদিন ভোরের বেলা ডাক দিতে পারে এমন একজন আপন সখার মত হয়ে গেলেন ।সে গল্প তো ফুরাবার নয় ।
এ বছরের মত কবিপক্ষ শেষ হোলো । কোলাহল তো বারণ হল , এবার কথা কানে কানে ।
**************************
আমার সেই বিহানবেলার কথা । আমি তখন এতই ছোট যে বাড়ির বড়রা কোনো ব্যাপারেই আমাকে মনুষ্যপদবাচ্য মনে করত না।সব জায়গায় আমি দুধুভাতু । বাড়িতে মা বাবা দাদা বউদি দিদি মিলে প্রচুর লোক । আমি আর আমার পিঠোপিঠি এক দাদা , দুজন ছিলাম বাড়ি সুদ্ধ লোকের দাদাগিরি , দিদিগিরি ফলানোর সফট টারগেট । বাড়িতে মাঝে মাঝেই সবাই মিলে আড্ডা জমত নানা বিষয়ে, আমরা গুটি গুটি সেখানে গিয়ে জুটলেই কেও না কেও ঠিক বলে উঠত – তোরা এখানে কি করছিস , যা পড়তে বোস ।
এই সম্মিলিত অবহেলার বিরুদ্ধে আমরা মাঝে মাঝে গর্জে উঠতাম । কিন্তু প্রতিপক্ষ অনেক বেশি শক্তিশালী । তারা নির্বিচারে দমননীতি প্রয়োগ করতো । এবং আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য হতাম । কিন্তু মনে মনে কোথাও একটা বিদ্রোহ দানা বাঁধত ।
অগত্যা আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন না গেয়ে দুস্টুমির ফন্দি ফিকির খুঁজে বেড়াতাম ।
এমনি সময়ে মনে আছে ,আমার মেজদার পরিচালনায় আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের মহড়া চলত । রবীন্দ্রনাথ তখন আমাদের কাছে পাঠ্য পুস্তকে পড়া -‘ অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি’ কবিতাটির লেখক এবং একজন ধবধবে সাদা দাড়ি গোঁফে মুখ ঢাকা ছবির মানুষের বেশি কিছু নয় ।মহড়া হত বিকেল বেলায় । আমাদের বসবার ঘরের সামনে চটি জুতোয় ভরে যেত । যথারীতি সে খানে আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল না । অথচ সেই সময়টা মোটেই আমাদের পড়তে বসার সময় নয় । অগত্যা মহড়ার সময় আমরা বাড়ির বাইরে বেড়া দেওয়া ছোট্টো বাগানে কিছু না কিছু নিয়ে খেলতাম । আমরা লক্ষ করলাম অনেক গানের মধ্যে একটি কোরাস গানে একটি লাইন আছে – ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো ও ও ও , আগুন জ্বালো ও ও --- । আমরা একটা কাজ পেলাম । এই গানটি শুরু হলেই আমরা বাগানের যত শুকনো পাতা এক জায়গায় জড় কোরে রাখতাম । আগুন জ্বালো—ওওও শুনলেই আমাদের একশন শুরু হয়ে যেত । ‘ব্যর্থ প্রাণ’ ব্যপারটা ঠিক কাকে বলে তা জানা ছিল না , তবে সেটা এক ধরনের দাহ্য পদার্থ তাতে কোনো সন্দেহ ছিলো না । দিনের আলো নিভে আসা সন্ধের মুখে ওই সম্মিলিত সুরে ‘আগুন জ্বালো’ গানের সঙ্গে শুকনো পাতা গুলো দাও দাও করে জ্বলে ওঠা এই দুই মিলে বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার হত । কিছু যেন একটা ঘটে যেত আমাদের মনে মনে । ‘ব্যর্থ প্রানের’ অভাবে ওই শুকনো পাতাগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে হয়ত আমাদের একটা প্রতিবাদ ছিল । যত দূর মনে পড়ে সেই প্রতিবাদের মধ্যে দিয়েই আমার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম এনকাউন্টার ।
*******
আমাদের শিল্প শহর টি ছিল প্রকৃত অর্থে কসমোপলিটান । আমাদের কলোনি টির এক একটি রাস্তা ভারতবর্ষের এক একটি নদীর নামে ছিল । যমুনা , গন্ধক , পালা , জোহিলা , ওয়ারধা ইত্যাদি । তেমনি এক একটি বাড়িতে এক এক প্রদেশের মানুষ ও থাকতেন ।তাই আমরা রামনবমী , পঙ্গাল , ছট পুজো , গনেশ চতুর্থী , ঈদ , ক্রিসমাস সব কিছুরই কিছু কিছু আঁচ পেতাম আমাদের ওয়ারধা রোডের বাড়িতে বসে । কখনো কখনো পড়শীদের কাছ থেকে নেমতন্ন আসত ঈদের সেমাই খাবার , ছট পুজোর ঠেকুয়া খাবার , সরস্বতী পুজোর গোটা সেদ্ধ খাবার , দীয়ালির লাড্ডু খাবার । কখনো কারো বাড়ি থেকে , কখনো দূর থেকে ভেসে আসা মাইক্রোফোনে কানে আসতো কাওয়ালি – হামে তো লুঠ লিয়া মিলকে হুস্ন ওয়ালো নে , কালি কালি বালো নে গোরে গোরে গাল নে । তেমনি ইংরেজী গান শুনতে পেতাম কে সারা সারা/ হোয়াট এভার উইল বি উইল বি । আবার কখনো ভাংড়া গান , - কি ম্যায় ঝুট বোলিয়া , কোই না , ভাই কোই না, কখন বা হোলির সময় ঢোলক খঞ্জনি বাজিয়ে সমস্বরে ভোজপুরী গান । দূর থেকে ভেসে আসা সে সব গানের তাল ও সুরের ঝাকুনি আমাকে দুলিয়ে দিত । আমি কোলাহল আর গানের মধ্যে তফাত করাতে শিখছিলাম নিজে নিজেই ।
বাড়িতে একটা রেডিও ছিল । কিন্তু সেটা চালানর অধিকার তখন পাইনি । ওটা দাদারা চালাতেন । এক দাদা নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সর্ট ওয়েবে বিনাকা গীতমালা শুনতেন । আমিন সায়ানির উপস্থাপনায় সপ্তাহের সব হিট গান বাজাত । খোয়া খোয়া চাঁদ , ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি ফির কঁহা , ম্যায় রঙ্গিলা প্যার কা রাহী , যো ওয়াদা কিয়া হ্যায় নিভানা পড়েগা ইত্যাদি টুকরো টুকরো গানের কলি অঙ্ক কসতে কসতে কানে ভেসে আসত । রবীন্দ্রনাথ তখনও আমার কাছে অনাগত । শত বর্ষ উদযাপনের আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্ত সব শহরে গ্রামে গঞ্জে – আজকের মত ‘তোমাদেরি লোক ‘ বলে খ্যাত হয়ে উঠতে পারেন নি । বিশেষ করে বিহারের এক শিল্প শহরে বেড়ে ওঠা বালকের কাছে রবীন্দ্রনাথের পৌঁছোন টা ত বেশ দুস্করই ছিল ।
আমার মেজদা ছিলেন একজন আপাদমস্তক সংস্কৃতিবান এবং রবীন্দ্রনাথ-আশ্রিত মানুষ ছিলেন।কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ সবই লিখতেন । সেই বয়সে অবশ্য সে সব বুঝবার ক্ষমতা আমার ছিল না । তিনি আমার চেয়ে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের বড় ।তাই আমার শৈশবে তিনি যুবক । মেজদা এক অননুকরণীয় ভঙ্গীতে গল্প বলতে পারতেন । যে কোনো গল্পই তাঁর বলার ভঙ্গীতে একেবারে চলচ্চিত্র হয়ে উঠত আমাদের কাছে । সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ।সে সময় আমাদের পাড়া এবং আশে পাশের অঞ্চলের যে কোন বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পুরধা হতেন মেজদা ।
একবার জানতে পারলাম মেজদা কাবুলিওয়ালা বলে একটি নাটক করাবেন । আরও জানতে পারলাম সে নাটক আসলে রবীন্দ্রনাথের একটি গল্প থেকে মেজদার নাট্যরুপ । সে নাটকে অভিনয় করবে মিনির ভুমিকায় আমাদের পাশের বাড়ির রেখাদি , কাবুলিওয়ালার ভুমিকায় আমার ছোটদা আর মিনির বাবার ভুমিকায় স্বয়ং মেজদা । মনে আছে , কাবুলিওয়ালার পোশাক জোগাড় করা একটা সমস্যা হয়েছিল । আমাদের পাড়ায় আসা যাওয়া করত সত্যিকারের এক কাবুলিওয়ালা । সুদ কিস্তির ব্যাবসা করতে । তাকে বলে কয়ে তার পোশাক ধার করা হয়েছিল । তার জন্যে সে কিছু সুদ আদায় করেছিল কিনা তা আজ আর মনে নেই । তবে নাটক দিব্যি জমে উঠেছিল । মাসিমা কাকিমারা নাটক দেখে প্রচুর অশ্রু বিসর্জন করে ছিলেন আর এর পর রেখাদি কে সবাই মিনি বলেই ডাকতো। আর আমি জানতে পারলাম রবীন্দ্রনাথ গান বানান , কবিতা লেখেন আবার গল্প ও লিখেছেন ।
সাল্ টা ঠিক মনে নেই । তবে ১৯৫৭ সালে তপন সিনহা কাবুলিওয়ালা ছবিটি করেন । এটা তার আগের ঘটনা ।
এর আগে কেউ কাবুলিওয়ালা গল্পের নাট্যরুপ অন্য কেউ দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই ।
কিছুদিন পরে মেজদার বিয়ে হল । যত টুকু মনে পড়ে সেদিন প্রবল বর্ষণ হয়ে চারিদিকে জল জমে গিয়েছিল । আর কানাঘুসো আমার কানে এসেছিল আমরা নাকি আগ মার্কা ঘটি কিন্তু মেজোবউদি কট্টর বাঙ্গাল বাড়ির মেয়ে। তখন কার দিনে সমন্ধ করে ঘটি বাঙ্গালের বিয়ে খুব স্বাভাবিক ছিল না ।এটা নিয়ে আত্নীয় সজন রা ঈষৎ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এটা আমার পিতা ঠাকুরের নির্ণয় ছিল । তিনি সম্ভবত মেজবউদির গান শুনেই অন্য সবাইকার ওজর আপত্তি তুচ্ছ করে এই সিধান্ত নিয়ে ছিলেন ।
মেজবউদি আসার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে গান যেন জীবন্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো সুগন্ধী ধুপের গন্ধের মত । তখন তো আর জানতাম না কান্ত বাবুর ক্ল্যারিওনেট বাঁশি থেকে বেরনো সুর কেমন করে কিনু গোয়ালার গলির সমস্ত আকাশে অনাদী কালের বিরহ বেদনা ছড়িয়ে দেয় । কিন্তু আমাদের ২৪ নম্বর ওয়ারাধা রোডের বাড়িতে মেজ বউদি গান ধরলে তেমনি একটা কিছু হোতো । এ গান রেডিও তে বা মাইকে বাজা গানের মত নয় । হারমনিয়াম সঙ্গে গলার আওয়াজ মিলে গান গুলো যেন আমার কানের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে খুলতে চেস্টা কোরতো এতকালের অনুদ্ঘাটিত একটা চোরা কুঠুরি যেখানে লুকিয়ে রাখা থাকত আমার একান্ত নিজের কিছু অদ্ভুত সব কষ্ট ।
তখন গান ব্যাপারটা তো এত অনায়াসে পাওয়ার মত ধন ছিল না । ইচ্ছে অনিচ্ছায় আজকের মত গান মানুষের কানে উপযাচক হয়ে ঢুকে পড়তো না ।
পাড়ার মহিলারা অনেকেই গান শুনতে চলে আসতো সময় অসময়ে ।
প্রেম মুদিত মনসে কহো রাম রাম রাম , হরি হরি সুমিরন করো এই সব ভজন গাইতেন পাড়ার দিদিমা ঠাকুমাদের অনুরোধে । আবার একটু আধুনি্ক কাকিমা-জেঠিমাদের অনুরোধে গাইতেন ‘ রুপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরুপ রতন আশা করে ‘
অরুপ-রতনের সন্ধান তো আজও পাওয়া হোলোনা । তবে সন্ধান শুরু বোধহয় হয়েছিল সেই গান শোনার পর থেকেই ।
মেজদা অফিস থেকে ফিরে আসার পর ওদের ভেজানো দরজার ওপার থেকে দুজনের মিলিত কন্ঠে শোনা যেত – আমি তোমারো সঙ্গে বেঁধেছি আমারো প্রাণ , সুরের বাঁধনে ‘
একটু করে বুঝতে পারছিলাম রবীন্দ্রসঙ্গীত নাম দেওয়া গান গুলো একটু যেন অন্য রকম । সোজাসুজি কিছু বলে দেওয়া নয় । অথচ কিছু বলবার ইচ্ছেটাকে চাগিয়ে দেওয়া । আর কিছু কিছু শব্দ যার মানে পুরোপুরি বোঝা যায় না কিন্তু তবু বুঝবার প্রবল ইচ্ছে হয় ।
তখন বিয়েবাড়িতে উপহার দেওয়ার পালা টা সেরে দেওয়া হত মোটামুটি দু রকমের জিনিষ দিয়ে – সাড়ি আর বই । আর বইয়ের মধ্যে সব চেয়ে বেশি পড়ত ‘সঞ্চয়িতা’ । কারন ওটা বেশ সস্তায় পুস্টিকর বস্তু ।
মেজদার বিয়েতে একাধিক সঞ্চয়িতা পড়েছিল । তার একটা কি করে যেন আমার কাছেও পৌঁছে গেছল ।
এর আগে কোনো একটি অনুষ্ঠানে একজন আমার থেকে কিছু বড় একটি ছেলেকে খুব গলা খুলে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে শুনে ছিলাম । কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিয়েছিল । সেই কবিতাটাই খুঁজে বের করলাম । কবিতার নাম নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ
পড়তে পড়তে শরীরে যেন কেমন একটা ঢেউ খেলে গেল । অনেক অচেনা শব্দ । কিন্তু ছন্দ টা যেন ছাব্বিসে জানুয়ারি তে টাটা কোম্পানির সান্ত্রীদের কুচকাওয়াজের ড্রামের বাজনা । আরো একটু পড়তে পড়তে মনে হোলো একটা খোলস যেন আমাকে চেপে ধরতে চাইছে , আর হাত পা ছুঁড়ছি সে খোলসটা কে ছিঁড়ে ফেলার জন্যে ।
এও তো একটা বিদ্রোহ । সেই আগুন জ্বালো -আগুন জ্বালো গানটায় যে বিদ্রোহ ছিল সেটার সঙ্গে যেন কথাও একটা মিল আছে যেন । রবি ঠাকুর তা হলে ছবি তে যে রকম প্রশান্ত মুখে দেখা যায় , সে রকম মোটেই নন ।
হ্যাঁ , আমার সেই বিহান বেলায় রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহ হয়েই এলেন আমার কাছে ।
তার পর যত বেলা গড়িয়েছে , অনেক বার চেহারা পাল্টে পাল্টে এসেছেন আমার কাছে ।তারপর একদিন ভোরের বেলা ডাক দিতে পারে এমন একজন আপন সখার মত হয়ে গেলেন ।সে গল্প তো ফুরাবার নয় ।
এ বছরের মত কবিপক্ষ শেষ হোলো । কোলাহল তো বারণ হল , এবার কথা কানে কানে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন