শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৪

রুপকথার অলিন্দে এক নিভৃতচারী কবি ও কিছু বঙ্গ-সঙ্গ-প্রসঙ্গ



ছোড় আয়ে হম ওহ গলিয়াঁ

*************************************

দেশভাগ যেমন বাঙ্গালিদের একটা প্রজন্মের বুকে একটা চিরস্থায়ী ক্ষতচিন্হ রেখে গেছল ঠিক তেমনটাই ঘটেছে পাঞ্জাবীদের এক প্রজন্মর সঙ্গেও | ছিন্নমূল হয়ে জন্মভুমি থেকে পালিয়ে আসার দুঃখটা ভুলতে পারেনি ওরাও | আমাদের মানিক বাঁড়ুজ্যে ‚ ঋত্বিক ঘটক ‚ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দের মত পাঞ্জাবী সাহিত্যের জগতের অমৃতা প্রীতম ‚ রাজিন্দর সিং বেদী ‚ সাদাত মন্টো ‚ ভীষ্ণ সাহানিরা ভুলতে পারেন নি দেশভাগের যন্ত্রণা |তাদের গল্পে বার বার ফিরে এসেছে সে কথা | সেই প্রজন্মেরই এক জন সম্পুরন সিং প্রায় কিশোর বয়সেই ছেড়েছিলেন ঝীলম জেলার দীনা নামের এক অখ্যাত শহর | সমস্ত পরিবার রুজী রুটি রোজগারের তাগিদে যখন অমৃতসর চলে যায় সম্পুরন বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে চলে আসে বোম্বাই শহর | স্বপ্ন লেখক হবে | 
অচেনা অজানা শহর | শুধু বুকে একরাশ স্বপ্ন সম্বল করে পাড়ি বুম্বাইনগরী |জাত শিল্পীরাই পারে এমন সাহস দেখাতে | গাড়ীর গ্যারেজে কাজ করে প্রাথমিক অন্নসংস্থান |গ্যারেজে সম্পুরনের কাজ ছিল একসিডেন্টে রং চটে যাওয়া গাড়ি গুলোতে রংয়ের প্রলেপ দেওয়া | এটা করতে গিয়ে তাকে অনেক রং মিশিয়ে মিশিয়ে ম্যাচিং রংটা খুঁজে বার করতে হত | গুলজার পরে বলেছিলেন এই আলাদা আলাদা রং মিশিয়ে অন্য একটা নতুন রং তৈরি করাটা পরে তাকে কবিতা লিখতে সাহাজ্য করেছিল |

কিছুদিন পর কি করে যেন পরিচয় হয়ে যায় আর এক স্বপ্ন দেখা মানুষের সঙ্গে ‚ যিনি সম্পুরনের কথায় জীবন-যাপন করতেন না ‚ সিনেমা-যাপন করতেন |তার নাম বিমল রায় |রতনে রতন চেনে প্রবাদটি যদিও ব্যাঙ্গার্থে প্রয়োগ হয় ‚ তবু এমন দুই রতনের মুলাকাত অনেক সময় ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছ | বিমল রায় সম্পুরন কে এসিস্টান্ট করে নিলেন | তখন তিনি বন্দিনী ছবিটি করছেন | জরাসন্ধের গল্প | তিনি ছবিতে এমন একটি গান দিতে চাইছেন যে গানে থাকবে বাংলার মাটির গন্ধ ‚ আর থাকবে বৈষ্ঞব পদাবলীর ছন্দ | গানের সুর করবেন শচীন কর্তা | এ তো তাঁর নিজের সাম্রাজ্য | তাঁকে নিয়ে চিন্তা নেই | কিন্তু কে লিখবেন এমন গান |চিন্তা করছেন বিমল রায় | হ্যাঁ একজন পারবেন | তিনি শৈলেন্দ্র | কিন্তু সেই সময়ে শৈলেন্দ্রর সঙ্গে শচীন কর্তার একটু মনমামিন্য চলছে | কেও একজন বললেন ঐ সম্পুরনকে দিয়ে চেষ্টা করবেন ? উর্দু তার মাতৃভাষা ‚ থাকতো পাকিস্তানে ‚ ও কি করে পারবে এমন স্বভাবে বাংলা জাতে হিন্দি গান লিখতে ! কিন্তু কোথাও একটা ভরসা ছিল এই পাঞ্জাবী ছেলেটার উপর | তাকে প্রায় বলতেন ঐ মোটর গ্যারেজ তোমার জায়গা নয় | তুমি সিনেমার গান লেখো গল্প লেখ | তাই সুযোগটা তাকে দিয়েই দিলেন | শুধু তাই নয় এই সিনেমার আর একটি গান - যেটি গাইবেন স্বয়ং শচীন কত্তা এবং যার সুরটা হবে ভাটিয়ালে ধাঁচের ‚ সেটাও গুলজারকে লিখে দিতে বললেন |

তিনটি ব্যাপার ঘটলো |
এক- দুটি কাল জয়ী গান সৃষ্টি হল -
মোরা গোরা রং লেইলে ‚ মোহে শ্যাম রং দেইদে
ছুপ যায়েঙ্গে রাত মে ‚ মোহে পীকে সঙ্গ দেইদে

আর একটি - ওরে মাঝি ‚ মেরে সাজন হ্যায় উস পার ‚ ম্যয় মন মার‚ তু উস পার ......

দুই -সম্পুরন সিংয়ের নবজন্ম হল গুলজার দিনভী নাম নিয়ে 
তিন- এক দিকে বিমল রায় আর একদিকে শচীন কর্তা দুই দৈত্য-প্রতীম বাঙ্গালি প্রতিভার মাঝে পড়ে পাঞ্জাবী ছেলেটার কোথাও একটা বং-কনেকশন তৈরী হয়ে গেল | বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটা খিদে তৈরি হল | যেটা তাকে ছাড়লো না কোনো দিন |

----------------------------------------------------
ম্যায়নে তেরে লিয়ে হি সাত রং কে স্বপ্নো চুনে
*****************************************
বিমল রায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করার সময়ে সলিল চৌধুরির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়ে গেল |

তিনিও এক স্বপ্ন-পাগল মানুষ |
কাবুলিয়ালা তে একটি আর প্রেম পত্র তে একটি করে গান লেখার সুযোগ হল | কাবুলিওয়ালা তে গঙ্গা ছবির আমায় ডুবাইলি রে গানটি সুরে হিন্দি কথা বসালেন - গঙ্গা আই কঁহা সে ‚ গঙ্গা যাই কঁহা রে | আর প্রেম পত্র ছবি তে - শাওন কি রাতোঁ মে এইসা ভি হোতা হ্যায় | 
এই সময় গুলজার আর সলিল চৌধুরি দুজনেই IPTA এর একটি বিভাগ PWA মানে পোগ্রেসিভ রাইটারস এসোসিয়েসনের সদস্য | সেই সুত্রে সহিত্য নিয়ে অনেক আদান প্রদান হত দু জনে এবং আরো অনেক লেখক কবিদের সঙ্গে |
স্কুলে থাকতেই রবীন্দ্রনাথ অনুবাদে পড়েছিলেন | প্রচন্ড ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ বাংলায় পড়ার | বাংলা শেখাও শুরু করলেন | তিনি নিজেই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ পড়াটা তার জীবনে সব চেয়ে বড় Turning point | রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনেক গান কবিতায় উঁকি মেরেছেন জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে | সে কথা পরে হবে |


এর পর ঐ ষাট ও সত্তরের দশকে আরও আটটি ছবিতে দু জনে একসঙ্গে কাজ করেছেন |

গুলজারের যখন প্রথম সিনেমা পরিচালনার কথা ভাবেন তখন সলিল চৌধুরি কেই বেছে নেন |তপন সিনহার বাংলা ছবি আপনজনের হিন্দি রিমেক | এই সিনেমার একটি গানে যেন সলিল চৌধুরির নিজস্ব স্যাটায়রের ছাপ পাওয়া যায় |সেই নন্দলাল বা এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয় তে যে ধরনের স্যাটায়ার সলিল চৌধুরি এনে ছিলেন ঠিক সেইরকমের স্যাটায়র দেখা গেল গুলজারের লেখা মেরে অপনের একটি গানে -

-
আব-ও-হাওয়া দেশ কি বহুত সাফ হ্যায়
কায়দা হ্যায় ‚ কানুন হ্যায় ‚ ইনসাফ হ্যায়
আল্লা মিয়াঁ জানে কো ই জিয়ে ইয়া মরে
আদমী কো খুন য়ুন সব মাফ হ্যায়
আউর ক্যেয়া কহুঁ
ছোটি মোটি চোরি‚ রিসয়ত খোরি
দেতি হ্যায় অপনা গুজারা ইঁহা
আপ কি দুয়া সে বাকি ঠিক ঠাক হ্যায়
হাল চাল ঠিক ঠাক হ্যায় |


আনন্দ সিনেমার দুটি মৃত্যুহীন গান ম্যায়নে তেরে লিয়ে হী সাত রংকে স্বপ্নে চুনে আর কঁহী দুর জব শ্যাম ঢল যায়ে - যতটা সলিল চৌধুরির ঠিক ততটাই গুলজার সাহেবের হয়ে থাকবে চিরকাল |

কিশোর কুমার কে একেবারে অন্যরকম ভাবে ব্যবহার করেছিলেন সলিল চৌধুরি একটি গানে |
মেরে অপনে ছবিতে - কো ই হোতা মেরে অপনে জিসকো হম অপনে কহ লেতে | তিন সপ্তকের গান যা সিনেমার গানে খুব দুর্লভ | কিশোরের গলার মন্দ্র সপ্তকের গাম্ভীর্য কে চমৎকার ভাবে প্রয়োগ করলেন |

সলিল চৌধুরি প্রথম দিন থেকেই গুলজারের সলিল দা হয়ে গেছলো |গানের বাইরে অনেক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আদান প্রদান হত |কোথাও একটা সমাজ সচেতন মন তৈরি হয়ে গেছলো গুলজারের ভিতর | তার জন্যে হয়তো সলিলদা অনেকটাই দায়ী ছিলেন |

সলিল চৌধুরি সম্মন্ধে গুলজারের একটি উক্তি - উনি ছিলেন শ্যাম্পেনের না খোলা বোতলের মত ‚ যা খুললেই চারিদিকে ছড়িয়ে যায় | উনি যেখানে যখন যেতেন মুহুর্তে নিজেকে ছড়িয়ে দিতেন | 


খোয়াব চুন রহী রাত ‚ বেকরার হ্যায়‚ তুমহারা ইন্তেজার হ্যায় ......
*********************************************************
হেমন্তকুমার সুর করতেন ঠিক তাঁর মত করে | মানে সরলতা ‚ আভিজাত্য ‚ সংবেদনশীলতা যেমন তার চরিত্রের বৈশিষ্ট ছিল ‚ তেমনি তার করা সুরেও এই গুন গুলিও থাকতো | গুলজার কে তাই খুব পছন্দ হয়ে ছিল তাঁকে | হয়তো উল্টোটাও হয়েছিল |
হেমন্তকুমার যেমন সাদা টুইলের সার্ট আর ধুতি পরে বোম্বাইয়ের গ্লামারের জগত কে পাত্তা দিতেন না ‚ গুলজার ও তেমনি সাদা পা জামা কুর্তা তেই কাটিয়ে দিলেন চিরকাল |

গীতিকার হিসেবে সত্যিকারের বড় ব্রেক পেলেন হেমন্তদার কাছ থেকেই | গায়ক হিসেবে যিনি প্রবাদপ্রতীম হয়ে গেছেন বলিয়ুডে ‚ এবার নামলেন ছবি প্রযোজনাতে | হেমন্তকুমার তখন বলিয়ুডে সব শ্রদ্ধেয় নামগুলির মধ্যে একটি | বাংলা গল্প ভাড়াটে চাই থেকে ছবি করবেন বিবি আউর মকান | এই সিনেমার দশটি গানই লেখার ভার দিলেন গুলজারকে | নানা রকমের গান | রফি সাহেবের গাওয়া জানে কঁহা দেখা হ্যায় ‚ কঁহা দেখা হ্যায় তুঝে খুব হিট করে |
কিন্তু একটি কমেডি গানে গুলজার নিজের প্রতিভার বহুমুখীতা চিনিয়ে দেন -

রহনে কো ঘর দো ‚ রহনে কো ঘর দো
ছত পে হো ফর্স ইয়া ফর্স পে ছত হো
খিড়কি ইড়কি বিজলি উজলি
ঘন্টি ওয়ানটি কুছ নহি চাহিয়ে প্যারে
বস এক ছোটা সা দরওয়াজা হো ‚ রহনে কে ঘর দো -

এর পর হেমন্তদার সঙ্গে যে মধুর সম্পর্কটা তৈরী হয়ে গেল তার ফসল আরও পাঁচটি ছবি- সন্নাটা ‚দো দুনি চার ‚ রাহগীর‚ খামোসী ‚ উস রাত কে বাদ | 
প্রত্যেকটি ছবিতেই অসাধারন সব গান আছে | তবে আমি উল্লেখ করছি কিছু গান যার কথা হিন্দি সিনেমার প্রচলিত ধারা থেকে একেবারে অন্যরকম | আর হেমন্তকুমারের সহজিয়া সুরে গানের কথা গুলি যেন নিটোল কবিতা হয়ে ধরা দেয় | 

সন্নাটা ছবির একটি গান হেমন্ত শুধু হারমোনিয়াম বাজিয়ে রেকর্ড করেছিলেন | সম্ভবত হিন্দি সিনেমায় এ রকম শুধু হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটি পুর্নাঙ্গ গান রেকর্ড করা একবারই হয়েছিল | হয়তো গানটি কব্যগুনকে স্ম্মান জানিয়েই হেমন্ত কুমার এমনটা করেছিলেন | গানটি এ রকম 

ওহ দাসতাঁ যো হমনে কহি ভি
হমনে লিখি
আজ ওহ খুদ সে শুনি হ্যায়

বস এক চুপসী লগি হ্যায়
নহি উদাস নহী
কঁহি পে সাঁস রুকি হ্যয়
নহী উদাস নহী |

দো দুনি চার ছবির একটি গান -
-
হাওয়া পে লিখ দো হাওয়া কা নাম
হম অন্জান পরদেশিয়োঁ কা সলাম |
পুরো গানটাই প্রকৃতির রুপ কে বন্দনা করে লেখা |

আর একটি গান | খামোসী সিনেমার | যেমন তার সুরের চলন ‚ যেন দু পাশে রজনী গন্ধা গাছের সারির মাঝ দিয়ে সরু আলপথ ‚ সেখানে আলতো পা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে একটি ঘুঙ্গুর পরা মেয়ে | আর গানের কথা ‚ অনবদ্য উপমায় প্রেম কাকে বলে তা বোঝাবার চেষ্টা করা হচ্ছে |

-
হমনে দেখী হ্যায় ইন আঁখোকী মহকতী খুসবু
হাতসে ছুঁকে ইসে রিস্তো কা ইল্জাম ন দো 
সির্ফ অহসাস হ্যায় য়ে রুহ সে মহসুস করো
প্যার কো প্যার হী রহনে দো‚ কো ই নাম না দো |

আর একটি গান যতবার শুনি ততবার ভাবি এই এই ইমন রাগ আধারিত অসাধারন সন্ধা-সঙ্গীতটি হেমন্ত মুখার্জী সুরারোপ করার পর গানটি কি করে নিজে গাওয়ার লোভ সম্বরন করে কিশোর কুমার কে দিয়ে গাওয়ালেন -

-
এ শ্যাম কুছ অজীব সী হ্যায়
ওহ শ্যাম ভী অজীব থি
ও কল ভি পাস পাস থি
আজ ভি করীব হ্যায়

হেমন্তকুমারের সঙ্গে শেষ ছবি ছিল ১৯৬৯ সালে উস রাত কে বাদ |ছবিটি চলেনি | তাই এর গান ও খুব একটা কেও শোনেনি |
তবে একটি গান শুধু অসামান্য কথার জন্যে অমর হয়ে থাকবে |

-
মেরী আওয়াজ কিসি শোরমে গর ডুব গয়ী
মেরী খামোশী বহুত দুর তক শুনায়ী দেগি




রাহো পে রহতে হ্যায়‚ ইয়াদোঁ মে বসর করতে হ্যায় ‚ খুশ রহো অহলে-এ-য়তন ‚ হম তো সফর করতে হ্যায় ..................
******************************************

এনাতে ওনাতে দেখা হয়েছিল কি জানি কবে কোথায় সে প্রশ্নে আমরা নাইবা গেলাম | | কিন্তু দুই বিপরীত মেরুর মিলন হবার অনিবার্যতার কথা দুজনেরই নিয়তিতে কোনো এক ব্রাহ্ম মুহুর্তে বলিয়ুডের বিধাতা পুরুষ স্বয়ং লিখে দিয়েছিলেন |
এ যেন বৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে ‚ঘরের কোনের নরম আলোর মোমবাতিটির মিলন ‚ পাহাড়ী ঝর্নারটির সঙ্গে গভীর জলের সমাহিত ঝিলটির মিলন | 
এক জন কোলাহলের ভীড়ে কবিতার জন্য পছন্দের ' লব্জ ' খুঁজে বেড়ান- আর এক জন বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সুরীলা আওয়াজ খুঁজে বেড়ান | 
এক জনের কবিতায় নুক্কড় ‚ মহল্লা‚ গলি ‚ বিজলীর খম্বা‚ শীতের দুপুরে খাটিয়ায় শুয়ে রোদ পোহানো ‚ ডাঁটি ভাঙ্গা ছাতা নিয়ে বৃষ্টি ভেজা এই সব উঠে আসে চলমান জীবন থেকে | আর এক জনের গানে মিশে যায় রেলের হুইসিল ‚ মন্দিরের ঘন্টা ‚ঢেঁকির শব্দ ‚ অচেনা পাখীর ডাক | 

একদা কি করে মিলন হল দোঁহে কী ছিল বিধাতার মনে |

পঞ্চম আর গুলজার দোঁহের মিলন ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে চিরকালের সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ইতিহাস হয়ে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই |

গুলজার বলেছেন - আমি নিজের যৌবন পঞ্চম কে দিয়ে দিয়েছিলাম | সত্যিই তো ১৯৭২ থেকে ১৯৯১ | আঠাশটা ছবি |
তার সঙ্গে কাটানো সময়টাকে গুলজার এক কথায় বলেছেন - কুছ লমহে বেচইনি কা |
সত্যিই তো অনেক অস্থির যন্ত্রণার মুহুর্ত না কাটালে অমন সৃষ্টির ফসল ফলে না | এই ফসল আমরা কয়েকশো বছর ধরে আমাদের খামারে ভরবো |

|
আমরা বরঞ্চ কয়েকটা বিশেষ দিনের বা মুহুর্তের কথা বলি | যেমন সেই প্রথম দিনটি | গুলজার যখন ছবির জগতে এলেন তখন অনেক দিন থেকেই মাথায় ঘুরছে Sond of Music নিয়ে ছবি করার কথা | যখন করবেন বলে ঠিক করেছেন তখন ভাবনা এলো যে ছবিতে গানই হবে ছবির প্রাণ সে ছবিতে গানের ভার কাকে দেওয়া যায় |আর ডির কথাই মাথায় এলো | ফোন করে আর ডি কে বললেন একটি গানের কথা | সেদিনই রাত একটার সময় গুলজারের বাড়ির দরজায় খট খট | দরজা খুলে দেখেন আর ডি দাঁড়িয়ে | হুকুম হল চল মেরে সাথ নীচে | আর ডি গাড়িতে চাপিয়ে গুলজার কে নিয়ে মধ্যরাতের মুম্বাইয়ের পথে পথে ঘুরতে লাগলেন আর শোনাতে লাগলেন গুলজারের লেখা গানটিতে তার করা সুর -
মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ
না ঘর হ্যায় না ঠিকানা
মুঝে বস চলতে যানা ........

সেই শুরু হল পরের কুড়ি বছর ধরে ' বস চলতে যানার ' সফর |

কত রকমের গান যে বাঁধা হয়েছে দু জনে মিলে | কখনো মাটির গন্ধ মাখা সহজ কথা ‚ কখনো দুরুহ কবিতার ভাষা ‚ যা হিন্দি ছবির চলতি ধারায় মিল খায় না | 

ইস মোড়সে যাতে হ্যায় ‚ কুছ সুস্থ কদম রাহে ‚ 
কুছ তেজ কদম রাস্তে 
পত্থর কে হাওয়েলি কো ‚ শীশে কে ঘরওন্দে মে
তিনকো কে নশেমন তক

ইস মোড় সে যাতে হ্যায় ......

এমন ভাবগম্ভীর কবিতাকে একটি জনপ্রিয় গানের রুপ দেওয়া বড় বিস্ময়কর কাজ | না জানি দুই বন্ধুতে কত ঝগড়া ঝাটির পর এই গানটিকে ফাইনাল টেক পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছিলেন |

আর একটি গানের কথা মনে পড়ছে ‚ যেটা লিরিকস যখন গুলজার পঞ্চম কে দিলেন গুলজার বেজায় চটে গিয়ে বললেন এর চেয়ে আজকের নবভারত টাইমস কাগজ টা দিয়ে আমাকে সুর লাগাতে বলতে তো সেটা এর চেয়ে সহজ হত | গুলজার কিছু না বলে সরে এলেন | বুঝতে পারলেন চ্যালেঞ্জ টা পঞ্চম নিয়ে ফেলেছেন | 

কিছুক্ষন পর যখন ফিরে এলেন তখন সে গানে সুর দেওয়া হয়ে গেছে ‚ কবিতার স্পিরিটটি কে একেবারে ঠিক ঠাক অনুসরন করে কি অপূর্ব সুর ই না দিয়েছেন | গানটি-

ইজাজত ছবির - মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়‚
শাওন কে কুছ ভিগে ভিগে দিন রখ্খে হ্যায় 
আউর মেরি এক খত মে লিপটি রাত পড়ি হ্যায়
ও রাত বুজা দো
মেরা ওহ সামান লোটা দো ....... 

এমন অনেক গানের কথা এই পরিসরে সবটা বলা যাবেনা |

শুধু রাহুল দেব চলে যাওয়ার পর গুলজারের একটি প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় তাদের বন্ধুত্ব টা কোন পর্যায়ের ছিল -

ক্যেয়া তুমহে পতা থা পঞ্চম কি তুম চুপ হো যাওগে আউর ম্যায় তুমহারে আওয়াজ ধুঁডতা ফিরুন্গা ?

গুলজার সাব ‚ আপনি ঠিকই বলেছিলেন - ইয়ে গলত হ্যায় কি ওয়ক্ত গুজর যাতা হ্যায় ‚ ওয়াক্ত ‚ টাইম ‚ ইটারনাল হ্যায় ‚ পারমানেন্ট হ্যায় | আউর কভি নহি গুজরতা ‚ যো গুজর যাতা হ্যায় ওহ হম আউর তুম হ্যায় |


--------------------------------------------------

জোৎ্স্না রাতে তাজ মহলের চারিদিকে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ালে হটাৎ হটাৎ করে তাজ মহলের গায়ে বসানো এক একটা পাথরের উপর চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হওয়া ঝলকানি ‚ মুহুর্তের জন্য দেখা যায় ‚ আবার মিলিয়ে যায় | আগে নাকি ঐ পাথর গুলো সত্যিকারের মনি মুক্তো ছিল | ইংরেজরা যাওয়ার সময় সে সব খুলে নিয়ে গেছে | এখন তার জায়গায় ঝুটা পাথর বা কাঁচ লাগানো আছে | তবুও জোৎস্নায় তাদের ঝিলিক দেখা যায় | কিন্তু দিনের প্রখর আলোয় সে সব পাথর গুলো চোখে পড়ে না | জোৎ্স্না রাতের আলো আঁধারেতেই ধরা দেয় আমাদের চোখে |

গুলজার সাহেবের শায়রী ‚ গান ‚ নজ্ম গুলি শুনতে শুনতে বা পড়তে সে রকম মুহুর্তের জন্য যে ঝলক দেখা যায় তা কখনো ঝলক দেখায় মির্জা গালিবের কখনো রবীন্দ্রনাথের ‚ কখনো জীবনানন্দের কখনো আবার সুকান্ত ‚ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের | কিন্তু তাঁর পরিশীলিত উর্দু জুবান যা জল তরঙ্গের মত আমাদের কানে বাজে ‚ তার মিঠাস তাঁকে অনন্য করে রাখে |

রাহুলদেব একবার গুলজারকে বলেছিলেন উর্দু অলফাজের sound গুলো তার ভালো লাগে | তাই সুর করতে সুবিধা হয় | ' পলকো কে নশেমন ' ( মানে খড়কুটোর নীড় )
শব্দবন্ধটি তার ভালো লেগেছিল ‚ প্রশ্ন করেছিলেন - ইয়ার ‚ এ নশেমন কিস শহর কা নাম হ্যায় ? 

একটি ছোট্টো শায়রীর কথা বলি যেটা শুনলেই আমাদের সুকান্তের একটি বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে যায়-

'
মা নে জিস চাঁদ সী দুলহন কী দুয়া দি থী মুঝে
আজ কী রাত উসে ওহ ফুটপাথ সে দেখা ম্যায়নে

রাত ভর রোটী নজর আয়া হ্যায় চাঁদ মুঝে '


****************************************************

আরম্ভ করেছিলাম দেশভাগের কথা দিয়ে | দেশভাগের কথা দিয়েই শেষ করি | কোন কিশোর বয়সে ছেড়েছিলেন নিজের জন্মভুমি | তার পর একটা সফল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটা ভাবনা আসে | যেখানে উঠে আসে পৃথিবীর যে কোনো দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষের কথা | 
অন্তত বাঙ্গালিরা যারা একদিন ছেড়ে এসেছিলেন তাদের ঘড় বাড়ি ‚ বন্ধু বান্ধব ‚ আত্নীয় স্বজন তাদের কাছে তো এই কবিতাটি একেবারে মনের কথা -

সুবহ সুবহ ইক খোয়াব কি দস্তক পর দরওয়াজ খোলা‚ দেখা
সরহদ কে উসপার সে কুছ মেহমান আয়ে হ্যায়
আঁখোসে মনুষ সারে
চেহরে সারে শুনে শুনায়ে
পাঁও ধোয়ে ‚ হাত ধুলায়ে
আঙ্গন মে আসন লগায়ে .....
আউর তন্নুর পর মোটে মোটে রোটি পকায়ে
পোটলি মে মেহমান মেরে
পিছলো সালে কি ফসল কা গুড় লায়ে থে

আঁখ খুলি তো দেখা ঘরমে কো ই নহীঁ থা
হাত লগাকর দেখা তো তন্নুর অভি বুঝা নহি থা
অউর হাথোমে মিঠে গুড় কা জায়কা অব তক চীপক রহা থা

খোয়াব থা শায়েদ
খোয়াব হি হোগা ! !
সরহদ পর কল রাত ‚ শুনা হ্যায় ‚
কুছ খোয়াবো কা খুন হুয়া হ্যায় |


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন